ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে মুক্তি ও গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে অনেক বেশি মূল্য দিতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন ও একটি সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র দেখার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র কখনোই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদ ও আহতদের ঋণ শোধ করতে পারবে না।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি। এ সময় তাঁর সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম সঙ্গে ছিলেন। জাদুঘরে পৌঁছালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাদুঘরের মহাপরিচালকসহ রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁকে স্বাগত জানান।
দর্শনার্থীর টিকিট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশের পর ‘লংওয়াক টু ডেমোক্রেসি’ ওয়াকওয়ে ঘুরে দেখেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার বিভিন্ন ধাপের ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এরপর দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে শহিদদের স্মরণে নির্মিত মেমোরিয়াল ও রেপ্লিকা আয়নাঘর পরিদর্শন করেন তিনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদ ও আহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাদুঘর প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারাও রোপণ করেন রাষ্ট্রপতি।
জাদুঘরের বিডিআর ম্যাসাকার, শাপলা ম্যাসাকার, নির্যাতনের সামগ্রী এবং জোরপূর্বক গুমের বিভিন্ন সেকশনও ঘুরে দেখেন তিনি। সেখানে শহিদদের চিঠি, স্মারক ও বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রাষ্ট্রপতি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি এবং শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলন ও সংগ্রামের বিভিন্ন চিত্র দেখার পর জাদুঘরের মনসুন থিয়েটারে একটি সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র দেখেন তিনি। প্রামাণ্যচিত্র চলার সময়ও তাঁকে অশ্রুসিক্ত ও আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়।
পরিদর্শন শেষে জাদুঘরের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে তিনি বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
রাষ্ট্রপতি বলেন, “ফ্যাসিস্টদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি, গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি, কিন্তু এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। রাষ্ট্র কখনোই এই শহিদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের ঋণ শোধ করতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “এ দেশে যেন আর কোনোদিন এ ধরনের মর্মান্তিক ও নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ না ঘটে।”
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরতে স্মৃতি সংরক্ষণ ও জাদুঘরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সবার দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের আত্মত্যাগকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ও আত্মোৎসর্গকারী ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
রাষ্ট্রপতি শহিদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সবার দ্রুত সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করেন। শহিদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের ত্যাগ ও সাহসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের পরিবারের প্রতিও সমবেদনা প্রকাশ করেন তিনি।
পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতিকে জাদুঘরের বিভিন্ন স্থাপনা ও দলিলপত্র সম্পর্কে ব্রিফ করেন জুলাই জাদুঘরের গবেষণা দলের সদস্য জুবায়ের ইবনে কামাল ও ফারহান মাসুদ।
এ সময় জুলাই জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, আবরার ইলিয়াস ও মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।