রুপালি ইলিশের হাসিতে ভাটা: অস্তিত্ব সংকটে চাঁদপুরের ঐতিহাসিক বড় স্টেশন মাছঘাট

এফএনএস (মিজানুর রহমান; চাঁদপুর) : | প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
রুপালি ইলিশের হাসিতে ভাটা: অস্তিত্ব সংকটে চাঁদপুরের ঐতিহাসিক বড় স্টেশন মাছঘাট

​ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিকে ডাকাতিয়া নদীর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাট শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল না, এটি ছিল এ দেশের ইলিশ অর্থনীতির প্রধান হৃৎস্পন্দন। একসময়ে এই ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল হরেক রকম জৌলুস ও আভিজাত্যের ইতিহাস। প্রতিদিন ভোরে হাজার হাজার মণ রুপালি ইলিশের পসরা আর বেচাকেনার হাঁকডাকে মুখরিত থাকত চারপাশ। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যেখানকার ইলিশ পৌঁছে যেত ভিনদেশি শৌখিন মানুষের ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত।

​তবে সেই সোনালী দিনগুলোর গৌরব আজ শুধুই স্মৃতির পাতা। বর্তমান মৌসুমেও এই ঐতিহ্যবাহী মাছঘাটে নেই চিরচেনা সেই কর্মব্যস্ততা। পদ্মা ও মেঘনার বুক চিরে ফিশিং বোটভর্তি ইলিশ নিয়ে জেলেদের দল বেঁধে ঘাটে ভেড়ার দৃশ্য এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না। সারি সারি ট্রলারের বদলে এখন সড়কপথে ছোট-বড় পিকআপ ভ্যানে করে আসা কিছু ঝুড়িভর্তি ইলিশ দিয়েই খুঁড়িয়ে চলছে এই ঐতিহ্যবাহী মোকামের কার্যক্রম। পাইকারি বিক্রি করার জন্য আড়তের সামনে ইলিশের স্তূপ নেই বললেই চলে।

ইলিশ সহ নদীতে ধরা কিছু মাছ টুরকিতে সাজিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের দখলে এখন পুরো মাছঘাট। ​আকাশছোঁয়া দাম ও মধ্যবিত্তের হাহাকার নদী ও সাগরে ইলিশের দুষ্প্রাপ্যতার সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা ও পাইকারি বাজারে। ভরা মৌসুম চললেও ঘাটে সরবরাহ এতটাই কম যে বাজারের আগুনে পুড়ছে সাধারণ ক্রেতার পকেট। সম্প্রতি সপ্তাহের ব্যবধানে কিছু এলাকায় দাম সামান্য কমলেও, তা এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে ক্রেতাদের গুণতে হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে প্রায় তিন হাজার টাকা। দুই কেজি ওজনের বড় আকৃতির ‘রাজা ইলিশ’ কখনো বা সাড়ে চার হাজার টাকা কেজি দরেও বিক্রি হওয়ার রেকর্ড রয়েছে।

​ঢাকা কিংবা আশেপাশের জেলা থেকে ঘুরতে আসা শৌখিন ক্রেতা মহসিন পাটওয়ারী আক্ষেপ করে জানান,নদীর পাড়ের মানুষ আমরা ঘাটে এসেও যদি চড়া দামে খালি হাতে ফিরতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের শখ কীভাবে মিটবে?” 

এখনতো এই ঘাটে ভরপুর ইলিশ থাকার কথা,মাছ কৈ? যা আছে ইলিশের দামে আগুন! যে ঘাটে একসময় মৌসুমে কোটি কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা হতো, আজ সেখানে মন্দার কালো ছায়া। পুঁজি হারিয়ে এবং ক্রমাগত লোকসানের বোঝায় অনেক আড়তদারই আজ প্রায় সর্বস্বান্ত। বরফকল মালিক, পরিবহন শ্রমিক থেকে শুরু করে ঘাটকেন্দ্রিক ছোট-বড় শত শত কর্মজীবী মানুষ আজ বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।

​চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবেবরাত সরকার জানান, নদীদূষণ, নাব্য সংকট এবং স্থানে স্থানে জেগে ওঠা ডুবোচরের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক গতিপথ ও প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি অসাধু জেলেদের একটি চক্র প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে ছোট জাটকা ও মা ইলিশ নিধন করছে।

চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক কঠোর অভিযানের কথা বললেও, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম প্রকাশ করেছেন বড় ধরনের উদ্বেগের কথা। তিনি জানান, ইলিশ রক্ষায় পূর্বে ব্যবহৃত বিশেষ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং নতুন বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় রাজস্ব খাত থেকে এর ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাছাড়া পর্যাপ্ত জনবল ও স্পিডবোট চালকের সংকটের কারণে আগামী অক্টোবর মাসের মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাঙালির প্রাণের খাবার আর ঐতিহ্যের প্রতীক ইলিশকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সুনির্দিষ্ট ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নদীর তলদেশের ডুবোচর খনন, শিল্পবর্জ্য দ্বারা নদীদূষণ রোধ, অবৈধ জালের বিস্তার কঠোরহস্তে দমন এবং মৎস্য বিভাগের প্রশাসনিক দুর্বলতা কাটিয়ে না উঠলে চাঁদপুর শুধু তার ইলিশের ঐতিহ্যই হারাবে না, মানচিত্র থেকে ফিকে হয়ে যাবে এই ঐতিহাসিক মাছঘাটের নামও। 

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে