জ্বালানি সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
জ্বালানি সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন

জ্বালানি সঙ্কটে ব্যাহত হচ্ছে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন। ফলে দিন দিন তীব্র হচ্ছে লোডশেডিংও। বর্তমানে গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির প্রায় সব বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ স্বল্পতায় ভুগছে। পাশাপাশি সব সময়ই রক্ষণাবেক্ষণে থাকে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে সব মিলিয়ে নিম্নমুখী দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। দেশে গ্যাস থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলে উৎপাদন করা যাচ্ছে না ৫ হাজার মেগাওয়াটও। কারণ কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। আর জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ালে বেড়ে যাবে আরো খরচ। তবু তেলচালিত কেন্দ্র বেশি হারে চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশে জ্বালানি তেল থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আছে। কিন্তু বেশিরভাগ তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রেই জ্বালানি তেলের সরবরাহস্বল্পতা থাকছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশে মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। তার মধ্যে ৬৪টি কেন্দ্র সরকারি, ৭০টি বেসরকারি ও  ভারত ও চীনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ৩টি কেন্দ্র রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দেশের ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। তার মধ্যে উৎপাদন বন্ধ ছিলো ২০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে। আর বাকিগুলো সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন করেছে। তাছাড়া দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ ছিলো। আর আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে চাইলেও তেলচালিত কেন্দ্র থেকে সব সময় উৎপাদন করা যায় না। কারণ মাঝেমধ্যে বিরতির কারণে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। এ অবস্থায় দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়ছে।

সূত্র জানায়, বিগত ২০২০-২০২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে বেসরকারি তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিপুল বকেয়া বাড়তে থাকায় কমানো হয়েছে উৎপাদনও। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বকেয়াসহ পিডিবির যেসব বিরোধ আছে, সেগুলো নিষ্পত্তি করা হলে এখনো তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে বর্তমানে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজে এলএনজি আমদানি, চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ উদ্যোগের মধ্যে সহসা সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পরিস্থিতি উন্নয়নে কাঠামোগত সংস্কার দরকার। তা নাহলে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, চুরি বন্ধ হবে না; সংকটও কাটবে না। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ হয়েছে ১৩ হাজার মেগাওয়াটের সামান্য বেশি। অর্থাৎ সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে ৮টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম। মূলত কারিগরি ত্রুটির কারণে পটুয়াখালীর পায়রা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রাখা হয়েছে। তাছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটেও কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। তার বাইরে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা দেড় হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। 

সূত্র আরো জানায়, সারা দেশের গ্রামে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তাছাড়া কিছু এলাকায় পিডিবি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। কিন্তু সরবরাহ ঘাটতির কারণে ওসব প্রতিষ্ঠানক একই এলাকায় একাধিকবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বর্তমানে দেশে দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও নিয়মিত কমছে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন। স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়। তার মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় ১০৫ কোটি ঘনফুট। এলএনজি থেকে সরবরাহ কমেছে। বর্তমানে দেশে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। কিন্তু গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমে সঙ্কট বেড়ে যায়। যদিও ১৫ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনাল গ্যাস সরবরাহ উপযোগী হলেও নির্ধারিত সময় এলএনজির কার্গো না আসায় সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। বরং গ্যাস সরবরাহ বাড়তে আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ফলে গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শিল্পে উৎপাদনও। তাছাড়া রান্না পরিবহনেও বেড়েছে গ্যাসের ভোগান্তি।

এদিকে এ প্রসঙ্গে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, দেশের দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আর ভারতের আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ না বাড়ায় চাইলেও তেলচালিত কেন্দ্র থেকে সব সময় উৎপাদন করা যায় না। বরং মাঝেমধ্যে বিরতির কারণে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহার করা যায়। তাতে করে বিদ্যুৎ ঘাটতি কিছুটা বেড়েছে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম জানান, তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজে এলএনজি আমদানি, চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ উদ্যোগের মধ্যে সংকট উত্তরণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সেজন্য কাঠামোগত সংস্কার দরকার। না হলে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, চুরি বন্ধ হবে না; সংকটও কাটবে না।