রিজার্ভ চুরি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ৯৮ বার পেছাল, নতুন তারিখ ১৯ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:০২ পিএম
রিজার্ভ চুরি মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন ৯৮ বার পেছাল, নতুন তারিখ ১৯ অক্টোবর
ছবি: সংগ্রহীত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আবারও পিছিয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা দাখিল করতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ কারণে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত আগামী ১৯ অক্টোবর নতুন দিন ধার্য করেছেন। এ নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে চলা মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ৯৮ বারের মতো পিছিয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক রোকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে ৯ আগস্টও প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় আদালত ১৪ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। নির্ধারিত সেই তারিখেও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা।

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে সাইবার হামলার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়। সুইফট কোড ব্যবহার করে পাঠানো অর্থের বড় অংশ পরে ফিলিপাইনে চলে যায়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশের ভেতরের একটি চক্রের সহায়তায় হ্যাকাররা অর্থ সরিয়ে নেয়।

ঘটনার পর ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে করা ওই মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ ধারাসহ তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৪ ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এর পরদিন, ১৬ মার্চ মামলাটির তদন্তভার সিআইডিকে দেন আদালত।

মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করছে সিআইডি। তবে প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত সময় দিলেও প্রতিবারই নির্ধারিত দিনে তা জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে মোট প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এর আগে ৩৫টি ভুয়া সুইফট বার্তা পাঠানো হয়। এর মধ্যে পাঁচটি নির্দেশনা কার্যকর হয়।

কার্যকর হওয়া নির্দেশনার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি হিসাবে এবং ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়। শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থের লেনদেনে নামের বানান ভুল থাকায় সেটি আটকে যায়। পরে ওই ২ কোটি ডলার বাংলাদেশে ফেরত আসে।

ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের বড় অংশ বিভিন্ন ক্যাসিনোর মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, সেখান থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ফলে চুরি যাওয়া অর্থের প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

তদন্তের অগ্রগতি ও সম্ভাব্য অভিযোগপত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান জানিয়েছে সিআইডি। চলতি বছরের ১৯ জুন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছিলেন, তদন্ত ও খসড়া অভিযোগপত্র নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে সিআইডির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা না করতে।

এর আগে কয়েকটি গণমাধ্যমে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত এবং এতে ৬৪ জনকে অভিযুক্ত করার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সিআইডি ওই তথ্য নাকচ করে জানায়, মামলাটির তদন্ত তখনও চলমান ছিল। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল এবং পরে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে বলেও জানিয়েছিল সংস্থাটি।

এদিকে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও দেশি-বিদেশি পর্যায়ে আইনি তৎপরতা চলছে। ফিলিপাইনের আরসিবিসির সঙ্গে সালিশ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আরসিবিসির কাছে মূল অর্থের পাশাপাশি সুদ ও আইনি খরচও দাবি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন।

চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে মামলা করে। পরে ২০২০ সালের ২৭ মে নিউইয়র্কের সুপ্রিম কোর্টে আরসিবিসিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি আদালত মামলার তিনটি অভিযোগ খারিজ করলেও অন্য অভিযোগগুলো নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলার সুযোগ রয়েছে।

অর্থ উদ্ধারের তৎপরতার মধ্যে ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত ফিলিপাইনের আরসিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্তের আদেশ দেন। সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় এ আদেশ দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশনায় বাজেয়াপ্ত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে ফেরত আনার কথাও বলা হয়।

তবে মূল মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা না হওয়ায় রিজার্ভ চুরির ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ শেষ হয়নি। নতুন ধার্য করা ১৯ অক্টোবরও সিআইডি প্রতিবেদন দিতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে