জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি পায়ের নিচে রেখে ডাকসুতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম
জিন্নাহ-গোলাম আযমের ছবি পায়ের নিচে রেখে ডাকসুতে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ
ছবি: সংগ্রহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে জিন্নাহ ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছবি পায়ের নিচে রেখে প্রতিবাদ করেছেন একদল শিক্ষার্থী। মঙ্গলবার দুপুরে ডাকসু ভবনের প্রবেশপথ ও সংগ্রহশালার মেঝেতে ছবি দুটি সাঁটিয়ে পদদলিত করেন ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী।

প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা বলেন, ডাকসুর সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ ও ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা আবদুল মালেকের ছবি সম্মানের সঙ্গে প্রদর্শনের প্রতিবাদেই তাঁরা এই কর্মসূচি পালন করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি বা পাকিস্তানপন্থী ভাবধারাকে সামনে আনার কোনো উদ্যোগ তাঁরা মেনে নেবেন না।

মঙ্গলবার বেলা আড়াইটার দিকে ডাকসুর প্রবেশপথের সামনে দুটি এবং সংগ্রহশালার ভেতরের মেঝেতে আরও দুটি ছবি সাঁটানো হয়। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের একজন ওয়াসিম উদ্দিন রাহাত বলেন, ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে জিন্নাহর মতো একজন নেতার ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় স্থান পাওয়া তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া সালাম, বরকতের দেশ। বাংলাদেশ ৩০ লাখ মানুষের রক্ত দিয়ে কেনা দেশ। সেখানে যে আমার ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছে, তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান দেওয়া আমরা কখনো সহ্য করব না।”

গোলাম আযমের ছবি মেঝেতে রাখার ব্যাখ্যায় ওয়াসিম উদ্দিন রাহাত বলেন, “গোলাম আযম একজন কুখ্যাত রাজাকার। সেই রাজাকারের ছবি ডাকসুতে স্থান পায়নি। তাই আমরা ঘৃণার প্রতীক হিসেবে মাটিতে লাগিয়েছি তাদের ছবি। এ দেশের মানুষের পায়ের নিচে থাকা উচিত তাদের।”

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী শিব্বির আহমেদ বলেন, ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমার ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি তুলে ধরার কথা ছিল। তাঁর প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তুলে ধরার দায়িত্বে থাকা একজন প্রতিনিধি কীভাবে একজন পাকিস্তানপন্থী ব্যক্তির ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় সম্মানের সঙ্গে প্রদর্শনের উদ্যোগ নিতে পারেন।

শিব্বির বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষমতা দিয়ে এবং বাংলাদেশপন্থীদের ক্ষমতা দিয়ে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি পায়ের নিচে লাগালাম। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশে কোনো পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি সামনে আনা যাবে না।”

তিনি আরও দাবি করেন, অতীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সামনে রেখে রাজনীতি করা হয়েছে। এখন সেটির জায়গায় জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি আনার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও তাঁরা প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন।

ইংলিশ ফর স্পিকারস অব আদার ল্যাংগুয়েজ বিভাগের শিক্ষার্থী আশ শামস বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জিন্নাহকে ঘিরে বিভিন্ন কর্মসূচি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট তাঁরা লক্ষ্য করেছেন। ডাকসু সংগ্রহশালা থেকে জিন্নাহর ছবি সরিয়ে নেওয়ার পরও এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখা যায় বলে জানান তিনি।

আশ শামস বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত ডাকসুর প্রতিনিধিদের বাংলাদেশের পক্ষে এবং বাংলাদেশপন্থী অবস্থানে থাকার প্রত্যাশা তাঁদের।

যেভাবে শুরু হয় বিতর্ক
সংস্কারের পর গত রোববার ডাকসু সংগ্রহশালা নতুন করে চালু করা হয়। সেখানে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি রাখা হয়। এর একটি ছিল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে, বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, দেওয়া তাঁর বক্তব্যের সময়ের ছবি। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।”

এ ছাড়া ১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনের একটি দলগত ছবি এবং ডন পত্রিকায় প্রকাশিত ওই সম্মেলনসংক্রান্ত প্রতিবেদনের কাটিং রাখা হয়। পাশাপাশি তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবিও প্রদর্শন করা হয়।

তবে সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি রাখা হয়নি বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রোববার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।

এর পর সোমবার দুপুরে ডাকসু সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। পরে ওই জায়গায় ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমের সামনে গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি টানিয়ে প্রতিবাদ জানান ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা।

এদিকে সোমবারের ঘটনার পর ডাকসু সংগ্রহশালা পরিদর্শন করেন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক’ নামে শিক্ষকদের একটি সংগঠনের সদস্যরা। পরিদর্শন শেষে দেওয়া ব্রিফিংয়ে সংগঠনটির সদস্যরা ডাকসুর ভেতরে ‘মব’ করে ভাঙচুরের অভিযোগ তোলেন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের ঘটনা তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সোমবার পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।

জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি পদদলনের এই কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত ছবি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হলো। একদিকে সংগ্রহশালায় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো প্রতীক বা ব্যক্তিত্বকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে