টিকে থাকতে ডাক বিভাগ নতুন সেবা ও আয়ের উৎস খুঁজছে

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
টিকে থাকতে ডাক বিভাগ নতুন সেবা ও আয়ের উৎস খুঁজছে

টিকে থাকবে ডাক বিভাগ নতুন সেবা ও আয়ের উৎস খুঁজছে। কারণ আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বর্তমানে কেউ ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠায় না। যদিও দাপ্তরিক ও আদালতের চিঠিপত্র এখনো ডাক বিভাগের মাধ্যমে চলে। তবে ডাক বিভাগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে পার্সেল, লজিস্টিকস ও ই-কমার্স পণ্য পরিবহন। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে আধুনিক লজিস্টিকস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে ডাক বিভাগ। বর্তমানে দেশে ৯ হাজার ৮৮৬টি পোস্ট অফিস রয়েছে। তার মধ্যে ডাক বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ৬০০টি এবং ৮ হাজার ৩০০টি এজেন্ট পোস্ট অফিস রয়েছে। ডাক বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ব্যক্তিগত চিঠি একসময় ডাক বিভাগের আয়ের অন্যতম উৎস থাকলেও এখন তার ব্যবহার প্রায় নেই। তবে ডাক বিভাগে দাপ্তরিক ডাক এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ডাকের পরিমাণ বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওসব ডাকের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ কোটি ৫ লাখ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ১০ লাখ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে ডাক বিভাগের আয়ও। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২১৯ কোটি টাকা ডাক বিভাগের আয় ছিল। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ২৫৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ৩ বছরে প্রায় ১১৭ কোটি টাকা ডাক বিভাগের আয় বেড়েছে। যদিও  ডাক বিভাগের প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা বছরে ব্যয় হয়। ওই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা বেতন-ভাতা এবং পেনশন ও আনুতোষিক বাবদ ২৬০ কোটি টাকারও বেশি। এ অবস্থায় ডাক বিভাগের আয় বাড়লেও ব্যয়ের তুলনায় তা অনেক কম। মূলত ডাক বিভাগের মোট বাজেটের ৯৩ শতাংশই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় খরচ হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে ডাক বিভাগ ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের প্রসার সামনে রেখে ঘরে ঘরে পণ্য পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। সেজন্য দেশব্যাপী ১৪টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওসব কেন্দ্রে পণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রসেসিং, বুকিং, বাছাই, পরিবহন ও বিলির ব্যবস্থা থাকবে। ওই লক্ষ্যে ঢাকার তেজগাঁওয়ের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ঈশ্বরদী, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, দিনাজপুর, হবিগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও যশোরে কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ডাকসেবার পরিধি বাড়াতে চালু করা হয়েছে উদ্যোক্তাদের যুক্ত করে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস। ওসব উদ্যোক্তা মূলত পণ্য সংগ্রহ ও বিলির কাজ করবে। ডাক বিভাগের নিয়ম মেনে চুক্তির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা হবে এবং সরাসরি তত্ত্বাবধান করবে। তবে অনিয়ম বা সেবার মান ক্ষুন্ন হলে চুক্তি বাতিল করা হবে।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে ডাক বিভাগ কৃষিপণ্য পরিবহনেও সম্ভাবনা দেখছে। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন উৎস জেলা থেকে ৩১২ টনের বেশি মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ডাক বিভাগ। তার মধ্যে রাজশাহীর আম ছাড়াও সাতক্ষীরা, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ফল পরিবহন করা হয়েছে। তাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তারা উপকৃত হয়েছে। তাছাড়া ডাকসেবায় অনলাইন ট্র্যাকিং ও ট্রেসিং সুবিধাও সমপ্রসারণ করা হচ্ছে। স্পিডপোস্ট ও এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিসের পাশাপাশি দেশব্যাপী মেইল প্রসেসিং সেন্টারও স্থাপন করা হয়েছে। ভূমির পর্চা ও খতিয়ান হোম ডেলিভারি, পাসপোর্টের বাল্ক ডেলিভারির পর এখন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক মামলা-সংক্রান্ত নথি প্রেরণও যুক্ত হচ্ছে ডাক বিভাগের সেবায়। তবে ডাক বিভাগের বড় চ্যালেঞ্জ দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট, পুরোনো ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান নিয়ে অভিযোগ। ওসব মোকাবিলায় ৩টি মেইল মনিটরিং সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে। যার মাধ্যমে ডাকের গতিপথ, বিলম্ব ও সরবরাহ কার্যক্রম নজরদারির আওতায় আনা হবে। একই সাথে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় অর্থ লেনদেন, পণ্য নিরাপত্তা ও গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।  মূলত প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবার মাধ্যমে লোকসানি প্রতিষ্ঠানটির ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে ডাক অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাকির হাসান নূর জানান, ডাক বিভাগ সরকারি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। সেজন্য শুধু লাভ-লোকসানের মাপকাঠিতে এর মূল্যায়ন করা যাবে না। প্রযুক্তির কারণে ব্যক্তিগত চিঠি কমলেও দাপ্তরিক ও আদালতের চিঠিপত্রের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে সড়ক ও রেলপথের সমন্বয়ে ডাক বিভাগে আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। সেজন্য দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ঢাকায় ২৪ ঘণ্টা এবং এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাছাড়া অনলাইন বিক্রেতাদের সুবিধার্থে চালু করা হয়েছে বাড়ি বা অফিস থেকে পণ্য সংগ্রহের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস মডেলও।