নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে বাড়তি চাপ। বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, ডিম, মাছ-মাংস ও বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আয়-রোজগার আগের মতো থাকলেও প্রতিদিনের বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকে হিসাব কষে সংসার চালাতে হচ্ছে। সরেজমিনে বাজিতপুর পৌর বাজার, কলেজ রোড, সরারচর ও আশপাশের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই নিত্যপণ্য কিনতে ক্রেতাদের ভিড়। তবে অনেকেই প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে কিনছেন। কেউ এক কেজির পরিবর্তে আধা কেজি, কেউ সপ্তাহের বাজার একবারে না করে দুই-তিন দফায় করছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, একই পণ্যের দাম দোকানভেদে ভিন্ন। আবার কয়েক দিন পরপরই দাম পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে বাজারে এসে নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিক্রেতাদের বক্তব্য বাজিতপুর পৌর বাজারের এক মুদি দোকানের বিক্রেতা ‘রহিম’ (ছদ্মনাম) বলেন, “আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না। পাইকারি বাজার থেকে যে দামে মাল কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করে বিক্রি করতে হয়। পাইকারিতে দাম বাড়লে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।”
আরেক বিক্রেতা ‘করিম’ (ছদ্মনাম) বলেন,“আগে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রি হতো, এখন অনেক ক্রেতাই পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। দাম বাড়ার কারণে বিক্রিও কমেছে। এতে ক্রেতা যেমন সমস্যায় আছেন, ছোট ব্যবসায়ীরাও চাপের মধ্যে আছেন।”
বাজিতপুরের এক পাইকারি ব্যবসায়ী ‘সেলিম’ (ছদ্মনাম) জানান, “বিভিন্ন পণ্য আমাদের স্থানীয় বাজারে আসে বাইরের জেলা ও মোকাম থেকে। সেখানে পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক খরচ ও অন্যান্য খরচ বেড়েছে। সরবরাহ কমে গেলে বা মোকামে দাম বাড়লে এখানেও দাম বাড়ে।”
তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, শুধু সরবরাহ ব্যয় নয়-মধ্যস্বত্বভোগী, অতিরিক্ত মুনাফা এবং বাজার তদারকির দুর্বলতাও কোনো কোনো পণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। এ বিষয়ে নিয়মিত বাজার মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
ভোক্তাদের ক্ষোভ বাজিতপুর উপজেলার এক মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী ‘জাহাঙ্গীর’ (ছদ্মনাম) বলেন,“মাসের শুরুতে বাজারের জন্য যে টাকা রাখি, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা শেষ হয়ে যায়। আগে যে টাকায় কয়েক দিনের বাজার করা যেত, এখন একই টাকায় প্রয়োজনীয় জিনিসও ঠিকমতো কেনা যায় না।”
একজন নিম্নআয়ের শ্রমজীবী ‘আবদুল হক’ (ছদ্মনাম) বলেন,“দিনে যা আয় করি, তার বড় অংশই বাজার খরচে চলে যায়। চাল-ডাল, তেল আর সবজির দাম দিতে গিয়ে মাছ-মাংস তো দূরের কথা, অনেক সময় প্রয়োজনীয় অন্য জিনিসও বাদ দিতে হয়।”
এক গৃহিণী ‘শাহানা’ (ছদ্মনাম) বলেন,“সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে বাধ্য হয়ে অনেক পণ্য কম কিনছি। আগে সন্তানদের জন্য কিছু বাড়তি খাবার কিনতাম, এখন দাম দেখে অনেক কিছুই বাদ দিতে হয়।”
বাজারে প্রয়োজন কঠোর নজরদারি স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, বাজারে নিয়মিত মূল্যতালিকা প্রদর্শন, পণ্যের ক্রয়মূল্য যাচাই এবং অতিরিক্ত মুনাফার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমবে না।
তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট বাজার মনিটরিং কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। প্রশাসনের বক্তব্য এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া হলে তিনি বলেন- বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
বাজিতপুরের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও কার্যকর বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে। কারণ, বাজারের আগুনে সবচেয়ে বেশি পুড়ছে সেই মানুষটি, যার আয় বাড়েনি-কিন্তু প্রতিদিনের খরচ বেড়েই চলেছে।