দীর্ঘ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতিতে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির হার কাগজে-কলমে সামান্য কমতির দিকে মনে হলেও বাস্তবে নিত্যপণ্যের বাজারে এর কোনো স্বস্তিদায়ক প্রতিফলন নেই। বরং ২০২৫ সালের আগস্টের তুলনায় ২০২৬ সালের আগস্টে একই পরিমাণ পণ্য কিনতে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের আয়ের হার না বাড়ায় জীবনযাত্রা আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন যাপনে। বেঁচে থাকার এই কঠিন লড়াইয়ে তাদের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে নির্মম ও বাধ্যতামূলক পরিবর্তন। চড়া দামের কারণে মাছ, মাংস, দুধ ও ফলমূলের মতো অপরিহার্য পুষ্টিকর খাবারগুলো এখন তাদের থালা থেকে একরকম উধাও হয়ে গেছে। অনেক পরিবারেই শিশুদের প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা মেটানো আজ অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল খাদ্যতালিকা নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল এবং ওষুধের বর্ধিত খরচ সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের বাজেট সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে পড়েছে। সঞ্চয় তো দূরের কথা, বহু পরিবারকে বাধ্য হয়ে আগের জমানো অর্থ ভাঙতে হচ্ছে কিংবা চড়া সুদে ধারদেনার শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। বিনোদন বা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান তো এখন তাদের কাছে বিলাসিতাচ্যুত এক কল্পনামাত্র। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই বিশাল ফারাক মানুষের পুষ্টি, শিক্ষা এবং সামগ্রিক জীবনমানে গভীর ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যাঁদের কোনো সঞ্চয় নেই, সেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম দিন দিন আরও শোচনীয় হয়ে উঠছে। এই মারাত্মক পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে হলে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো সিন্ডিকেট কৃত্রিম উপায়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়াতে না পারে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের পরিধি ও সহায়তা আরও সমপ্রসারিত করা অত্যন্ত জরুরি। জনজীবনের এই দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি ফেরাতে অবিলম্বে দৃঢ় ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশবাসী।