শরতের শেষের দিকেই শীতের পরশ পেতে শুরু করেছে শস্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত উত্তরবঙ্গের জেলা বগুড়া। আর এই সময়টাতেই চড়া দাম ও বাড়তি লাভের আশায় আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। জেলার মাঠের পর মাঠ এখন শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলার সবুজ পাতায় ছেয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং গত কয়েক মৌসুমের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার আগাম সবজি চাষে নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন বগুড়ার চাষিরা।
আশ্বিন মাসের শুরু থেকেই বগুড়ার শাজাহানপুর, শিবগঞ্জ, শেরপুর, গাবতলী ও কাহালু উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে কৃষকদের ব্যস্ততার চিত্র। কেউ ক্ষেতে পরিচর্যা করছেন, কেউ বা পোকামাকড় দমনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আবার অনেকে ইতোমধ্যে উৎপাদিত সবজি তুলতে শুরু করেছেন স্থানীয় বাজারের জন্য। আগাম বাজারে সবজির চাহিদা যেমন বেশি থাকে, তেমনি দামও পাওয়া যায় দ্বিগুণ। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই এবারও ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে আগাম সবজির আবাদ।
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, জেলাটি দেশের অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদন অঞ্চল। ঢাকার কারওয়ান বাজারসহ দেশের বড় বড় পাইকারি বাজারে বগুড়ার সবজির বিশেষ চাহিদা রয়েছে। প্রতি বছরই শীত মৌসুমের মূল সবজি বাজারে আসার আগেই আগাম সবজি আবাদ করে লাভবান হন এ অঞ্চলের চাষিরা। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম শীতকালীন সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগাম সবজি চাষে ঝুঁকি যেমন থাকে, তেমনি লাভের পরিমাণও থাকে বেশি। বৃষ্টির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে অনেক কৃষহই উঁচু জমিতে বা বিশেষ পলিথিন শেড (পলিহাউস) ব্যবহার করে চারা তৈরি ও রোপণ করেছেন। শিবগঞ্জ উপজেলার সবজিচাষি শফিকুল ইসলাম জানান, "অন্যান্য ফসলের তুলনায় আগাম সবজিতে কিছুটা বাড়তি খরচ ও মেহনত বেশি করতে হয়। তবে যদি বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসে, তবে এই বাড়তি সবজি দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি করা সম্ভব। গত বছর অতিবৃষ্টির কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও এবার আবহাওয়া বেশ ভালো রয়েছে। মহাস্থান হাটের আড়তদাররা জানান, বর্তমানে বগুড়ার মহাস্থানগড়, মহীপুর ও চণ্ডীহারা হাটে আগাম শিম, লালশাক, পালংশাক, মূলা ও কড়লা আসতে শুরু করেছে। পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি শিম ও ফুলকপি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। চাষিরা পাইকারি দর ভালো পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ঢাকা থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে বগুড়ার হাটগুলোতে ডেরা বেঁধেছেন ভালো মানের সবজি সংগ্রহ করার জন্য।
জেলার কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের সাশ্রয়ী মূল্যে সঠিক সময়ে মানসম্পন্ন বীজ, সার ও কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বিষমুক্ত বা জৈব উপায়ে সবজি উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভোক্তারা নিরাপদ সবজি পেতে পারেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সার্বনিক তদারকি করছেন যাতে পোকামাকড় বা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটালে চলতি মৌসুমে বগুড়ার কৃষকেরা আগাম সবজি থেকে কোটি টাকার ব্যবসা করবেন বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে দেশের বাজারে শীতের আগাম সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের মধ্যে সবজি পৌঁছে দিতে এই উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের ভূমিকা অপরিসীম। সব মিলিয়ে, আগাম সবজির ভালো ফলন ও ন্যায্য মূল্য পাওয়ার মধ্য দিয়ে বগুড়ার হাজারো কৃষক পরিবার এখন নতুন আশার আলো দেখছে।