মানবাধিকার সুরক্ষায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা দুর্বল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ)। সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া তিনটি আইন ব্যাপক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অন্তর্বর্তী সরকার যে সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করেছিল, তা দুর্বল করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এইচআরডাব্লিউ বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করতে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এসব অধ্যাদেশে গুম প্রতিরোধ, তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষমতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নির্বাচিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা কমিয়ে দিয়েছে এবং এর তদন্তের ক্ষমতাও দুর্বল করেছে বলে অভিযোগ করেছে এইচআরডাব্লিউ।
এইচআরডাব্লিউয়ের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত নিরাপত্তা খাত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে এমন একটি স্বাধীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান দরকার, যার মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। নিরাপত্তা বাহিনীকে নজরদারি ও জবাবদিহির বাইরে রাখার সরকারি উদ্যোগ জনগণের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করবে না যে হত্যা ও গুমের ঘটনা অতীতেই থেকে যাবে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, সমালোচকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল বলে জানিয়েছে এইচআরডাব্লিউ। সংস্থাটির ভাষ্য, গুম ও হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও তারেক রহমানের সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত শত শত ব্যক্তিকে নির্বিচারে আটক করে রেখেছে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করে। তবে সংস্থাটির স্বাধীনতা সীমিত ছিল এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতাও ছিল না। কমিশনের নিয়োগ কমিটিতে সরকার ও সরকারঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন কেবল সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে এবং সুপারিশ করতে পারত।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি কমিশনের সদস্য নিয়োগে আরও স্বাধীন ব্যবস্থা, স্বাধীন অর্থায়ন ও জনবল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আটককেন্দ্রগুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের জন্য জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছিল, যা নির্যাতনবিরোধী ঐচ্ছিক প্রটোকলের অধীনে প্রয়োজনীয়।
ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর অধ্যাদেশটি বহাল রাখা অথবা কার্যকারিতা হারানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু বিএনপি সরকার সেটি বহাল রাখেনি বলে জানিয়েছে এইচআরডাব্লিউ।
৬ সেপ্টেম্বর বিরোধীদের সংসদ বর্জনের মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত নতুন আইন পাস হয়। এই আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা কমিশনের নেই। কমিশন সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রতিবেদন না দিলে অথবা দেওয়া প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কমিশন নিজস্ব তদন্ত করতে পারবে, এমন একটি অস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনে কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আবারও সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি এর বাজেট ও প্রশাসনিক স্বাধীনতাও কমানো হয়েছে এবং জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার মর্যাদা ও স্বাধীনতা হ্রাস করা হয়েছে। এইচআরডাব্লিউয়ের মতে, তদন্তের ক্ষমতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও পর্যাপ্ত সম্পদের দিক থেকে নতুন আইনটি প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে হচ্ছে।
৬ সেপ্টেম্বর সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনও পাস হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ক্ষমতা বাদ দিয়ে অভিযুক্ত সংস্থা ছাড়া অন্য কোনো নিরাপত্তা সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে কমিশনকে আটককেন্দ্র, এমনকি গোপন আটকস্থল হিসেবে সন্দেহ করা জায়গাও পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন ও তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। নতুন আইনে সেই ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
এ ছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের অধ্যাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিধিতে থাকা কমান্ডের দায়বদ্ধতার মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল। সেখানে কোনো কর্মকর্তা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জানার কথা থাকা সত্ত্বেও তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে দায়ী হতে পারতেন। নতুন আইনে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দায়ী করতে তার সরাসরি নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ প্রয়োজন হবে।
১০ সেপ্টেম্বর সংসদ বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়ন আইন পাস করে। এর মাধ্যমে র্যাবের নাম পরিবর্তন করে বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়ন করা হয়। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সংস্থাটির সাত সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। এ ছাড়া র্যাবের কয়েকজন সাবেক সদস্যের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যার মধ্যে গুমের অভিযোগও রয়েছে, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলছে।
বিএনপি আগে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচও র্যাব বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল।
নতুন আইনে র্যাবের সদস্য, ক্ষমতা, সম্পদ ও নথিপত্র বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়নের কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন বাহিনীটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাহিনীটির প্রতীকেও র্যাবের পরিবর্তে শুধু বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়নের নাম ব্যবহার করা হয়েছে।
গত মে মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, নাম পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা নতুন বাহিনীটিতে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছে এইচআরডাব্লিউ।
এইচআরডাব্লিউ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যাটালিয়নের বিধিমালা প্রণয়নের সময় মানবাধিকার যাচাই, স্বাধীন বাহ্যিক তদারকি, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে সুরক্ষা, র্যাবের নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত সামরিক সদস্য মোতায়েন বন্ধের বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে সরকারের ওপর চাপ দিতে।
সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যকে বাংলাদেশের উদীয়মান মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে।
এলেইন পিয়ারসন বলেন, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আগের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তারেক রহমান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু নতুন সরকার দ্রুত শেখ হাসিনা সরকারের ‘নিপীড়নমূলক পদাঙ্ক’ অনুসরণ করছে দেখে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।