বিদ্যুৎ সঙ্কটে দেশে বাড়ছে জ্বালানি তেলের চাহিদা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৪ এএম
বিদ্যুৎ সঙ্কটে দেশে বাড়ছে জ্বালানি তেলের চাহিদা

বিদ্যুৎ সঙ্কটে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে গত বছরের ৮ মাসের তুলনায় চলতি বছরের ৮ মাসে প্রায় ২৯ শতাংশ ডিজেল এবং ১৫৭ শতাংশের বেশি ফার্নেস অয়েলের বিক্রি বেড়েছে। মূলত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জেনারেটরের ব্যবহার বাড়ায় বেড়েছে ডিজেলের চাহিদা আর বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে বেড়েছে ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও আমদানি খরচ বাড়লেও দেশের বাড়তি চাহিদা মেটাতে বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে জ্বালানি তেল। তবে দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি তেল বিক্রিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বিপুল লোকসান গুনছে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ওই সংস্থাটির লোকসান গত মার্চ থেকে চলতি মাসের গত সপ্তাহ পর্যন্ত ২৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিগত ২০২৫ সালের আগস্টে ৩ লাখ ২৩৩ মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হলেও চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৩ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অকটেনের বিক্রিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত বছরের আগস্টে ৩৪ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন অকটেন বিক্রি হলেও চলতি বছরের একই মাসে ৪৪ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন বিক্রি হয়েছে। ফলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরে অকটেনের বিক্রি ৯ হাজার ৭২৯ মেট্রিক টন বা ২৮.৩ শতাংশ বেড়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে পেট্রলের বিক্রির পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি। বিগত ২০২৫ সালের আগস্টে ৩৩ হাজার ৯৫৪ মেট্রিক টন পেট্রল বিক্রি হলেও চলতি বছরের আগস্টে ৩৫ হাজার ৬৭৪ মেট্রিক টন বিক্রি হয়েছে। ফলে এক বছরে পেট্রল বিক্রি বেড়েছে এক হাজার ৭২০ মেট্রিক টন বা ৫.১ শতাংশ। তবে ফার্নেস অয়েলের বিক্রিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। গত বছরের আগস্টে ৫৫ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি হলেও চলতি বছরের আগস্টে তা বেড়ে এক লাখ ৪৩ হাজার ৮৯৯ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। ফলে এক বছরে ফার্নেস অয়েলের বিক্রি ৮৭ হাজার ৯৭৪ মেট্রিক টন বা ১৫৭.৪ শতাংশ বেড়েছে।

সূত্র জানায়, তীব্র গ্যাস সঙ্কটে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে জেনারেটরনির্ভরতাও। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফার্নেস অয়েল এবং জেনারেটর চালাতে ডিজেলের ব্যবহার বাড়ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিপিসি ডিজেলে সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনছে। কারণ প্রতি লিটার ডিজেল আমদানি ও সরবরাহে প্রায় ২০০ টাকা খরচ হলেও গ্রাহক পর্যায়ে তা মত্র ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাতে বিপিসিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রতি লিটারে ৮৫ টাকার মতো। বর্তমানে দৈনিক প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। আর ডিজেলের বিক্রির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিপিসির লোকসানের পরিমাণও।

সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা পূরণে চড়া দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ। অথচ ওই খাতে পুরো বছরের সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা জন্য বরাদ্দ ছিলো। কিন্তু চড়া দামে এলএনজি আমদানি করে কম দামে বিক্রি করে গত ৬ মাসে নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে পেট্রোবাংলাকে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় আরো জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। একসময় প্রতি এমএমবিটিইউ ১০ থেকে ১২ ডলারে এলএনজি কেনা হলেও গত আগস্টে দাম বেড়ে ১৮ থেকে ২২ ডলারে ওঠে। ফলে সেপ্টেম্বরের জন্য কেনা ৯টি কার্গোর বেশির ভাগের দাম পড়েছে ২৩ থেকে ২৪ ডলার। আর অক্টোবরের কেনা কার্গোর দাম ২৮ ডলার পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ খাতেও লোকসানের চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসান ধরা হয়েছিল। কিন্তু কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। 

এদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। আর ডিজেলে সবচেয়ে বেশি লোকসান হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়েছে।  সেজন্য নতুন করে  চিঠিও দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির ওপর বিপিসির নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপিসির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আর বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ রয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে