দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:২৫ এএম
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই ৩৩৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর বিগত ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ৩৪ হাজার ৯২২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ১১  হাজার ৭৪৪টিই শুধু শিশু ধর্ষণের মামলা। শিশুরা নিজ ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থানে ওই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আর নিকটাত্মীয় ও পরিচিতদের মাধ্যমেই ঘটছে ওসব ঘটনা। শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপরাধীরা নানা কৌশল নেয়। তার মধ্যে রয়েছে শিশুদের খাবারের লোভ দেখিয়ে বা একা পেয়ে ধর্ষণ করা হয়। তাছাড়া খেলার সময় কৌশলে ডেকে নিয়ে এবং কিছুক্ষেত্রে ভয় দেখিয়ে বা ব্ল্যাকমেল করেও করা হয় শিশু ধর্ষণ। পুলিশ বিভাগ ও মানবাধিকার সংগঠন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে ধর্ষণের শিকার হয় ৩৩৬টি শিশু। তার মধ্যে ১২৭টি মেয়ে শিশু আর ২৪ জন ছেলে শিশু। আর বিগত ২০২৫ সালে পুরো বছরে দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ৩০৮টি। ফলে গত বছরের চেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই ঘটেছে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি শিশুরা। এমনকি শূন্য থেকে ৬ বছর বয়সি শিশুরাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। তবে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোর-কিশারীরা। আবার ওই শিশুদের মধ্যে ৩০০-এর অধিক সংখ্যক একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পর ৩৩৬ শিশুর মধ্যে ২ জন আত্মহত্যা করেছে, গর্ভধারণ করেছে ১১ জন আর হত্যার শিকার হয়েছে ৩২ জন। ধর্ষিত শিশুদের মধ্যে প্রতিবন্ধী শিশু ১৬ জন।

সূত্র জানায়, সাধারণত ঘর, পরিচিত সামাজিক ও পারিবারিক পরিবেশেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটছে। অনেক ঘটনাই ভুক্তভোগীর নিজের ঘরে, অপরাধীর বাসায়, নির্জন মাঠে, দোকান ও পরিত্যক্ত ভবন, স্কুল ও মাদ্রাসাতে ঘটছে। তার সাথে জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও। তাছাড়া শিশু ধর্ষণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্বপরিচিতরা জড়িত। হয়তো ওসব ব্যক্তিরা শিশুর প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, দোকানদার, নৈশপ্রহরী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেজন্যই শিশু ধর্ষণে অপরিচিতিদের জড়িত থাকার হার তুলনামূলক কম। আর অপরাধীদের বয়স ২০ থেকে ৬০ বছর বা তার বেশি। তার মধ্যে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সিরা জড়িত সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনায়।

সূত্র আরো জানায়, শিশু ধর্ষণের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও, খুব কম ক্ষেত্রেই অপরাধীর চূড়ান্ত সাজার তথ্য মিলছে। চলতি বছরে সংঘটিত ৩৩৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় ২২৯টি মামলা হয়। তার মধ্যে ৭৭টির মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে আর ৩০টি ক্ষেত্রে অভিযোগই করা হয়নি। ওসব মামলায় ২৬২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার মধ্যে অভিযুক্ত মাত্র ১৯ জন।

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান জানান, গ্রামাঞ্চলে কোনো শিশু ধর্ষণের শিকার হলে ভুক্তভোগীর পরিবার ওই ঘটনা চেপে রাখে। পাশাপাশি টাকা-পয়সা দিয়ে ঘটনা চাপা দেয়ার ঘটনা তো রয়েছেই। ধর্ষণের ঘটনায় সরকার থেকে বাধ্যতামূলকভাবে জেলা প্রশাসক ও ইউএনদেরকে মাঠপর্যায়ে গিয়ে ঘটনা তদারকি করার জন্য দায়িত্ব নিতে হবে। আর ধর্ষণের মামলা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চাপ থাকলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কাউকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ারও ব্যবস্থা করতে হবে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, ধর্ষণ মামলা নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে খুবই স্পর্শকাতর। সেজন্য মামলাগুলোর তদন্তে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সামপ্রতিক সময়ে অনলাইন জিডি ও পুলিশের কাছে রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। সেজন্য ওসব ঘটনায় মামলার সংখ্যাও বাড়ছে। তবে অপরাধ কমাতে সামাজিক সচেতনতা দরকার। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত বড় একটি অংশই আপনজন, পারিবারের সদস্য এবং পরিচিত লোকদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়। সেজন্য সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে