আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের রিটেইনার ফি ২৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ (সিডব্লুআই)। একই সঙ্গে ঘরোয়া ক্রিকেটারদের চুক্তির মেয়াদ ১২ মাস থেকে কমিয়ে সাত মাস করা হচ্ছে। খরচ কমাতে এ বছরের ছেলেদের সুপার৫০ ও মেয়েদের টি-টোয়েন্টি ব্লেজ টুর্নামেন্টও স্থগিত করেছে বোর্ড।
সিডব্লুআই জানিয়েছে, আর্থিক, উন্নয়নমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বড় ধরনের পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের সঙ্গে অবশ্য আগের মতো ১২ মাসের চুক্তিই থাকবে।
ক্যারিবীয় ক্রিকেটে কেন্দ্রীয় চুক্তি ছেড়ে টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে স্বাধীনভাবে ক্যারিয়ার গড়ার প্রবণতা আগে থেকেই রয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো সেই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিডব্লুআইয়ের প্রধান নির্বাহী ক্রিস ডেহরিং বলেছেন, খেলোয়াড় ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতাকে তারা স্বাগত জানাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “এটি আদর্শ কোনো পদক্ষেপ নয়, তবে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি প্রয়োজনীয়।”
ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আনছে সিডব্লুআই। বোর্ডের দাবি, ঐতিহাসিকভাবে বয়সভিত্তিক, উন্নয়নমূলক ও সিনিয়র পর্যায়ের পুরুষ ও নারী সব ধরনের জাতীয় দল এবং টুর্নামেন্টের পুরো ব্যয়ই তাদের বহন করতে হয়েছে। এর মধ্যে খেলোয়াড়দের বেতন, ম্যাচ ফি, বিমানভাড়া, হোটেল এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের খরচ রয়েছে। এই ব্যবস্থা আর্থিকভাবে টেকসই নয় বলে মনে করছে বোর্ড।
ডেহরিং জানিয়েছেন, গত ১৫ বছরে শুধু ক্যারিবীয় অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচলকারী সংস্থাগুলোর পেছনেই ৮ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি খরচ করেছে সিডব্লুআই। তবে এর বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন তিনি। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভ্রমণ ও আবাসনের উচ্চ ব্যয় কমিয়ে সীমিত অর্থ সরাসরি ক্রিকেটের উন্নয়নে ব্যয় করতে চায় বোর্ড।
আর্থিক সংকটের আরেকটি কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ঋণের কথাও জানিয়েছে সিডব্লুআই। চলতি বছরের জুলাইয়ে বোর্ডকে মোট ১ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলারের ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দেয় আইসিসি। আগামী এক বছরে তিন ধাপে ওই অর্থ পাওয়ার কথা রয়েছে।
সিডব্লুআইয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের নগদ অর্থপ্রবাহের সংকট সাময়িকভাবে সামলাতে এই ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে ঋণের অর্থ পেতে বোর্ডকে নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচক পূরণ করতে হবে।
সুপার৫০ টুর্নামেন্ট স্থগিত হওয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ানডে দল গঠনের প্রস্তুতিতেও প্রভাব পড়বে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আগামী বিশ্বকাপে অংশ নিতে তাদের ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে বাছাইপর্ব খেলতে হবে।
ওয়ানডে বিশ্বকাপের ওই বাছাইপর্বের প্রস্তুতিতে ঘাটতি যেন না থাকে, সে জন্য নভেম্বর মাসে সফরকারী ইংল্যান্ড ‘এ’ দলের বিপক্ষে একাধিক সাদা বলের ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে সিডব্লুআই। এরপর ওয়ানডে দলের একটি ক্যাম্পও আয়োজন করা হবে।
এদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিশেষ কাঠামোও আগামী দুই বছরে নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে। স্বাধীন কয়েকটি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত এই দলকে ঘিরে পৃথক দেশগুলোর খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আগামী বছর লিমায় অনুষ্ঠেয় প্যান আমেরিকান গেমস এবং ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে পৃথক দেশগুলো দল পাঠাবে।
২০২৫-২৬ মৌসুমের সুপার৫০ টুর্নামেন্টের শীর্ষ চার দলকে পুরুষদের প্যান আমেরিকান গেমসের বাছাই হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সেখানে ৫০ ওভারের বদলে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে খেলা হবে। মেয়েদের ইভেন্টে ২০২৫-২৬ মৌসুমের টি-টোয়েন্টি ব্লেজের শীর্ষ চার দল অংশ নেবে।
স্থগিত হওয়া সুপার৫০ ও টি-টোয়েন্টি ব্লেজের পরিবর্তে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের জন্য পুরুষ ও নারী বিভাগে আলাদা বাছাই টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে সিডব্লুআই। এসব টুর্নামেন্টের খরচ বহন করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ড।
ডেহরিং জানিয়েছেন, অলিম্পিকে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জনকারী সিডব্লুআইয়ের আওতাধীন ১০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসব বিকল্প টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে। টুর্নামেন্টগুলোর তারিখ এখনো চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বিজয়ী দলগুলো লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে জায়গা পাওয়ার জন্য আইসিসির অলিম্পিক বাছাইপর্বে খেলার সুযোগ পাবে।
আগামী বছরের নারী সুপার৫০ টুর্নামেন্টের পরিবর্তে একটি ‘বেস্ট বনাম বেস্ট’ উন্নয়নমূলক টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হবে। তবে চার দিনের ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়নশিপ আগের মতোই চলবে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে অনুসরণ করা দ্বিপক্ষীয় সিরিজের ১২ ম্যাচের কাঠামোই ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়নশিপে বহাল থাকবে। ওই কাঠামোয় প্রতিটি দল একটি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে তিন ম্যাচের একটি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলেছিল। সম্মিলিত পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ তিন দল প্লে-অফে জায়গা পেয়েছিল।