ময়মনসিংহ সদরের বেগুনবাড়ী স্লুইসগেট এলাকায় পানিতে ভাসতে থাকা একটি ড্রাম থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। উদ্ধারের চার দিন পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। এ ঘটনায় প্রধান আসামী শামীম মিয়াকে (৩৮) গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার শামীম মিয়া নেত্রকোনার কমলাকান্দা উপজেলার কৃষ্টপুর গ্রামের জালাল মিয়ার ছেলে। সে বর্তমানে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার গলগন্ডা এলাকায় বসবাস করতেন। নিহত নিরঞ্জন ধর (৫৪) ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানাধীন রমেন্দ্র চন্দ্র সুত্রধরের ছেলে। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর আউটার স্টেডিয়ামে এলাকায় বাড়া বাসায় বসবাস করতেন। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পিবিআই ময়মনসিংহ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান।
তিনি জানান, শামীম হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি। নিহত ব্যক্তি ময়মনসিংহের স্বর্ণকার ও অটোরিকশার মালিক নিরঞ্জন ধর। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সকালে ময়মনসিংহ সদরের বেগুনবাড়ী স্লুইসগেট এলাকায় পানির নিচে একটি ড্রামের ভেতর থেকে বস্তাবন্দী মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরদেহের ছবি ছড়িয়ে পড়লে নিখোঁজ নিরঞ্জন ধরের পরিবারের সদস্যরা ছবি দেখে তাঁকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সবিতা রানী ধর বাদী হয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি পিবিআই স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে।
পিবিআই জানায়, মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই ময়মনসিংহ জেলা পিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল ছায়া তদন্ত শুরু করে। পিবিআই সদর দপ্তরের সহযোগিতা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে গতকাল ২৬ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাজীপুরের গাছা থানার বোর্ডবাজারের বটতলার সর্দার মার্কেট এলাকা থেকে শামীম মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সেখানে তাঁর শ্যালক মাসুদ রানার ভাড়া বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন।
পিবিআইয়ের দাবি, নিরঞ্জন ধরের চারটি অটোরিকশা ছিল। সেগুলো ময়মনসিংহের খাগডহর এলাকার সততা গ্যারেজে রাখা হতো। শামীম ওই গ্যারেজের ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন। সেই সূত্রে নিরঞ্জনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। নিরঞ্জন নিয়মিত শামীমের বাসায় যাতায়াত করত। শামীমের বাবা-মা বাসায় না থাকার সুযোগে শামীম তাঁর ভাড়া বাসায় মেয়ে নিয়ে এসে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতেন। একদিন শামীমের অসতর্কতার সুযোগে নিরঞ্জন ধর একটি আপত্তিকর ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারন করেন। পরবর্তীতে তা দিয়ে শামীমকে ক্রমাগত ব্ল্যাকমেইল ও টাকা দাবি করতে থাকেন।
পিবিআই বলছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে শামীমের ভাড়া বাসায় গিয়ে আবারও টাকা দাবি করেন নিরঞ্জন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে শামীম ঘরে থাকা শিল দিয়ে নিরঞ্জনের মাথায় আঘাত করেন। এতে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাঁর মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়। পরে বটি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। হত্যার পর মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন শামীম। প্রথমে একটি চটের বস্তায় মরদেহটি ভরে একটি প্লাটিকের ড্রামের মধ্যে রাখা হয়। পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর রাত আটটার দিকে একটি মিশুক (ইজিবাইক) এনে ড্রামটি বেগুনবাড়ী স্লুইসগেট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ড্রামটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে শামীমের দেখানো মতে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শিল ও বটি জব্দ করেছে পিবিআই।
পিবিআই ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়েছিল। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পিবিআইয়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রচেষ্টায় দ্রুততম সময়ে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।