সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে সাইবার সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ যেন নিপীড়নমূলক না হয় এবং এর অপপ্রয়োগে কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করেই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রস্তাবিত আইনের খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ সভা শেষে ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সভায় গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে খসড়ায় আরও সংশোধন, সাংবাদিকদের সুরক্ষায় বিশেষ বিধান এবং অপপ্রয়োগ ঠেকাতে কার্যকর সুরক্ষাকবচ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের জন্য তৈরি করা খসড়া বিলটি আগে মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজন, সাইবার স্পেসে কাজ করা ব্যক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে খসড়াটি সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পক্ষ মতামত দিয়েছে। এসব মতামত সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় আইনটি নিয়ে আরও সময় নিয়ে মতামত নেওয়ার প্রস্তাব আসে। গণমাধ্যম যাতে আইনটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভুক্তভোগী না হয়, সে জন্য ‘সেভিং ক্লজ’ বা সুরক্ষামূলক বিধান রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকার এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, “আমরা মিডিয়াকে টার্গেট করে এই আইনটি করতে চাই না, চাই না এবং কোনো সাংবাদিক এটার শিকার হোক, এই আইনের অপপ্রয়োগ হোক, সেটাও আমরা চাই না।”
আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখার প্রস্তাব এসেছে। এর উদ্দেশ্য, কোনো ব্যক্তি যাতে দীর্ঘ সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে না থাকেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আগামী ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ পাওয়ার আশা করছে সরকার। এসব সুপারিশ সমন্বয়ের জন্য প্রধান তথ্য কর্মকর্তাকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ প্রক্রিয়া সমন্বয় করবে। সম্পাদক পরিষদ, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও এতে যুক্ত করা হবে।
সুপারিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে খসড়াটি আবার পর্যালোচনা করা হবে। এরপর মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের আগে সংশোধিত খসড়াটি পুনরায় সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ও অংশীজনেরা আবারও মতামত দিতে পারেন।
পরবর্তী ধাপে বিধি অনুযায়ী আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা শেষে খসড়াটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে। তবে সংসদে গেলেও তাড়াহুড়ো করে আইনটি পাস করা হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের আলোচনার পাশাপাশি সংসদের বাইরেও সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে মতামত নেওয়া হবে।
গণমাধ্যমের জন্য যথাযথ সুরক্ষাকবচ নিশ্চিত করতে গণমাধ্যম ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আরও আলোচনার প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি। এ ধরনের আলোচনার মাধ্যমে গণমাধ্যমের পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি প্রস্তাব তৈরি করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন মাহফুজ আনাম।
দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন পাস হলে বাংলাদেশ একটি বৃহৎ কারাগারে পরিণত হবে। তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে আইনটির সম্ভাব্য অপপ্রয়োগ নিয়ে গণমাধ্যমের একাংশের উদ্বেগ উঠে আসে।
বৈঠকে গণমাধ্যমের বিষয়গুলো দেখার জন্য একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রস্তাবও আসে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়গুলো ওই কমিশনের মাধ্যমে দেখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আইনটি এমনভাবে করা হবে, যাতে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডও বিবেচনায় নেওয়া হয়। সব পক্ষের মতামত নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে আইনটিকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য সরকারের।
পরামর্শ সভায় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সভাপতিত্ব করেন। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক ও প্রতিনিধিরাও সভায় অংশ নেন।