বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর একটি হলো এর উর্বর কৃষিজমি। শিল্প, খনিজ বা জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ না হলেও কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতার কারণে দেশটি আজও খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, যে জমি আমাদের খাদ্য উৎপাদনের মূল ভিত্তি, সেটিই প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অথচ কৃষিজমি কমছে। এই বাস্তবতা ভবিষ্যতের জন্য গভীর সতর্কবার্তা বহন করে। গত কয়েক দশকে নগরায়ণ, আবাসন প্রকল্প, শিল্পকারখানা, সড়ক নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি হারিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে উর্বর জমিকে ইচ্ছামতো ভরাট করে আবাসিক বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হলো, ইটভাটাসহ বিভিন্ন কাজে জমির ওপরের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ার প্রবণতা। একবার এই টপসয়েল নষ্ট হয়ে গেলে সেই জমির উৎপাদনক্ষমতা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন। এ অবস্থায় কৃষিজমি সুরক্ষায় নতুন আইনি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। ভূমির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ কৃষি অঞ্চল ঘোষণা, বহু ফসলি জমি সংরক্ষণ এবং অবৈধভাবে জমির শ্রেণি পরিবর্তন ঠেকানোর মতো বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে যেসব জমিতে বছরে দুই বা ততোধিক ফসল উৎপাদিত হয়, সেগুলোকে বিশেষ সুরক্ষার আওতায় আনার চিন্তা ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়; বাস্তবায়নই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। অতীতে পরিবেশ, নদী কিংবা ভূমি রক্ষায় অনেক আইন হয়েছে, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। কৃষিজমি সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি হলে নতুন আইন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি অফিস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অবৈধ দখল, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন কিংবা উর্বর মাটি কাটার ঘটনায় দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। কৃষিজমি শুধু জমির মালিকের সম্পদ নয়; এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত জাতীয় সম্পদ। আজ যে জমিতে ফসল উৎপাদন হচ্ছে, সেটি হারিয়ে গেলে আগামী প্রজন্মের খাদ্যের নিশ্চয়তা বিপন্ন হবে। উন্নয়নের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু সেই উন্নয়ন যেন কৃষিজমি ধ্বংসের বিনিময়ে না হয়।