রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম বেড়ে একেকটি ১৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। বড় বাজারে এক হালি বাদামি ডিম ৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও পাড়া-মহল্লার মুদিদোকানে একই চারটি ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা। ফলে এক ডজন ডিম কিনতে বাজারভেদে ১৫৫ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে ডিমের নতুন এই মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয় আরও বেড়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, আগারগাঁও ও মোহাম্মদপুরের কয়েকটি বাজার ঘুরে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে ডিমের বাড়তি দামের চিত্র পাওয়া গেছে। অধিকাংশ খুচরা দোকানে প্রতি পিস ডিম ১৪ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। সে হিসাবে এক ডজন কিনতে ১৬৮ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত লাগছে।
তবে বড় বাজারে ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের হালি ৫০ টাকা এবং পাড়া-মহল্লার দোকানে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের হিসাবে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে বাদামি ডিমের ডজন ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা, সাদা ডিম ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা এবং হাঁসের ডিম ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
শেওড়াপাড়া বাজারে ডিম কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগেও তুলনামূলক কম দামে ডিম পাওয়া যেত। এখন প্রতি পিস ১৫ টাকা শুনতে হচ্ছে। একসঙ্গে এক ডজন কিনলে সংসারে বাড়তি খরচ হচ্ছে। আয় একই থাকলেও বাজার খরচ বেড়ে যাওয়ায় অন্য পণ্য কম কিনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কাজীপাড়া বাজারের ক্রেতা সেলিনা আক্তার বলেন, মাছ বা মাংসের দাম বাড়লে অনেক পরিবার ডিম দিয়ে আমিষের ঘাটতি পূরণ করে। কিন্তু ডিমের দামও বাড়ায় সেই সুযোগ কমে যাচ্ছে। শিশুদের জন্য ডিম কিনতে হয় বলে দাম বাড়লেও তা পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
মিরপুর ৬০ ফিট এলাকার বাসিন্দা শাহানা আক্তার বলেন, কয়েক দিন আগে তরল দুধের দাম বেড়েছে। এর আগে বেড়েছে সয়াবিন তেল, আটা ও চিনির দাম। এখন ডিমের দামও বাড়ায় সংসারের খাবারের খরচ আরও বেড়েছে। তাঁর প্রশ্ন, এভাবে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষ খাবারের তালিকা কীভাবে ঠিক রাখবে।
ডিমের বাড়তি দামের প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যাভ্যাসেও। ক্রেতাদের কেউ প্রতিদিনের বদলে এক দিন পরপর ডিম কিনছেন। কেউ আবার পরিবারের শিশুদের জন্য ডিম রেখে বড়দের জন্য পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী ডিম কেনাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে বেশি দামে ডিম কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও দোকান পরিচালনার খরচ যোগ হওয়ায় আগের দামে ডিম বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। আগারগাঁও বাজারের বিক্রেতা মাইনুল ইসলাম বলেন, পাইকারি পর্যায়ে দাম কমলে খুচরা বাজারেও দাম কমবে।
মিরপুরের বিক্রেতা জামাল উদ্দিন বলেন, ডিমের দাম প্রতিদিন একই থাকে না। পাইকারি বাজারে যে দামে ডিম আসে, তার সঙ্গে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে খুচরা দাম নির্ধারণ করা হয়। সরবরাহ কমে গেলে বা পাইকারিতে দাম বাড়লে তার প্রভাব দ্রুত খুচরা বাজারে পড়ে।
বিক্রেতারা মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং লোডশেডিংয়ের সময় ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালানোর বাড়তি খরচের কথা বলছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলছেন, বছরের এই সময়ে অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে মুরগি কিছুটা কম ডিম পাড়ে। ফলে সরবরাহেও প্রভাব পড়ে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ডিম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ডায়মন্ড এগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার আহমেদ বলেন, গত দুই মাসে মুরগির খাবারের দাম কেজিতে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাঁর হিসাবে, আটটি ডিম উৎপাদনে এক কেজি খাবার প্রয়োজন হয়। ফলে দুই হালি ডিম উৎপাদনে খাবারের খরচ প্রায় ১২ টাকা বেড়েছে।
কায়সার আহমেদ আরও বলেন, ফিডের কাঁচামালের একটি অংশ এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এর পেছনে ওই দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিষয় থাকতে পারে এবং এতে কাঁচামালের দাম বেশি পড়ছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৪৪০ দশমিক ৬৫ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়েছে। একই হিসাবে জনপ্রতি বছরে ডিমের প্রাপ্যতা ১৩৭ দশমিক ১৯টি। (File Portal)
তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেশে জনপ্রতি দৈনিক ডিম গ্রহণের পরিমাণ ১২ দশমিক ৭ গ্রাম বলা হয়েছে, যা ২০১৬ সালে ছিল ১৩ দশমিক ৬ গ্রাম। ওই সময়ে ডিমের দাম বাড়ার কারণে মানুষের ডিম খাওয়ার পরিমাণ কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
ডিমের দাম নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে দেশে ডিমের দামও বাড়তে থাকে। একসময় বছরজুড়ে ডিমের ডজন ৮৫ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা ১২৫ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। কখনো এর চেয়েও বেশি হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ডিমের ডজনপ্রতি দাম ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের হিসাবে, ১ অক্টোবর ডিমের হালি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ছিল, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।
ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৭ সেপ্টেম্বর পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ডিম উৎপাদনে প্রকৃত খরচ এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহের বিভিন্ন ধাপে কতটা মূল্য সংযোজন ও মুনাফা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করবে সরকার।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সাংবাদিকদের বলেন, ডিমের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে।
বাংলাদেশের ডিমের দামের সঙ্গে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের বাজারেরও পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ডজন ডিমের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১১৫ টাকা। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ডজনপ্রতি দাম প্রায় ১৩৮ টাকা। ভারতের কলকাতায় ডজন ডিমের দাম প্রায় ১১৫ টাকা বলে বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের ২০২৪ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, মুরগির খাবার ও ডিমের দাম ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি। সমীক্ষায় এর অন্যতম কারণ হিসেবে আমদানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশীয় খাতকে অতিমাত্রায় সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
ডিমের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের চাপের চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের বাসিন্দা শাহানা আক্তারের ভাষায়, “কয়েক দিন আগে তরল দুধের দাম বেড়েছিল; এর আগে বেড়েছে সয়াবিন তেল, আটা ও চিনির দাম। এখন ডিমের দামও বাড়ল। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে মানুষ খাবেটা কী?”