বেকার পড়ে আছে অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাইটেক সিটি রেলস্টেশন

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
বেকার পড়ে আছে অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাইটেক সিটি রেলস্টেশন

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে সুবিশাল চত্বর আর নান্দনিক স্থাপত্যে নির্মিত হাইটেক সিটি রেলস্টেশনটি দূর থেকে দেখলে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু দৃষ্টিনন্দন এ কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখ কপালে ওঠার জোগাড়- যে স্টেশনে গড়ে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার যাত্রীকে সেবা দেওয়ার কথা, তা এখন যেন এক পরিত্যক্ত ভূতুড়ে চত্বর। প্রায় ৫২ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ে ২০১৮ সালে তৈরি এ স্টেশনে সারাদিনে থামে মাত্র একটি ট্রেন, তাও কেবল ঢাকার পথে এবং যার বরাদ্দের ঝুলিতে টিকিট মেলে মোটে ৭০টি। অথচ প্রতিদিন উত্তরবঙ্গের ২০টি আন্তঃনগর ট্রেন এ স্টেশন অতিক্রম করে অন্তত ৪০ বার যাতায়াত করছে। প্রায় সব দূরপাল্লার ট্রেন বিরতিহীনভাবে পার হয়ে যাওয়ায় বিশাল এ অবকাঠামো সাধারণ মানুষের কোনো কাজেই আসছে না, উল্টো ট্রেনের সুবিধাবঞ্চিত বিপুল জনগোষ্ঠী প্রতিদিন চরম যোগাযোগের ভোগান্তিতে দিন কাটাচ্ছে। এই আধুনিক রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকাতেই গড়ে উঠেছে কালিয়াকৈর হাইটেক সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি বাংলাদেশ। এছাড়া সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও চন্দ্রা এলাকার বিশাল শিল্পাঞ্চল ও জনবসতি এ স্টেশনকেন্দ্রিক রেলসেবার আওতায় আসতে পারত। কিন্তু বাস্তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতে এই স্টেশন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা জানান, ট্রেনের জন্য তাদের প্রায় ৩০ কিলোমিটার বিপরীতের জয়দেবপুর স্টেশনে যেতে হয়। এভাবে উত্তরবঙ্গের বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে বাধ্য হয়ে বিকল্প পথে কিংবা অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করে জয়দেবপুর বা বিমানবন্দরে যেতে হচ্ছে। অথচ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কালিয়াকৈরে ট্রেন না থামানোয় সরকারের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। রেলসেবা বঞ্চিত স্থানীয় অধিবাসী ও সচেতন মহলের মতে, স্টেশনটির এই অচলাবস্থার পেছনে মূল কারিগর একটি শক্তিশালী সড়ক পরিবহন সিন্ডিকেট। বিগত সরকারের আমল থেকেই ক্ষমতাশালী বাস মালিক নেতারা নিজেদের ব্যবসা ধরে রাখতে এই স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি বন্ধ রাখতে কলকাঠি নেড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ট্রেনের ভাড়া তুলনামূলক কম এবং ভ্রমণ নিরাপদ হওয়ায় এখানে ট্রেন থামলে দূরপাল্লার লোকাল ও আন্তঃনগর বাসে যাত্রী কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ছিলেন বাস মালিকরা। বাস সিন্ডিকেটের সেই বিরোধিতার কারণেই নাকি তৎকালীন প্রশাসন কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও ট্রেনের স্টপেজ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। ফলে পরিবহন মালিকদের কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের রেলসেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকার। যাত্রীহীনতার সুযোগে নির্জন এ স্টেশন চত্বর এখন পরিণত হয়েছে নানা অপকর্মের আখড়ায়। আলো ঝলমলে হওয়ার কথা থাকলেও রাতের অন্ধকার নামতেই এখানে আড্ডা জমায় মাদকসেবী ও স্থানীয় অপরাধীরা। শুধু তাই নয়, অরক্ষিত এই স্টেশনের ভেতরে থাকা মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ইলেক্ট্রিক্যাল তার এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ রেল সিগন্যালের তার একের পর এক চুরি হয়ে যাচ্ছে। সিগন্যালের তার কেটে নিয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিক পদ্ধতির বদলে অ্যানালগ পদ্ধতিতে চালাতে হয়, যা মেরামত করতেই চলে যায় ২ থেকে ৩ দিন। এতে ট্রেনের নিরাপদ চলাচলেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নিজেদের এবং স্টেশনের সুরক্ষার স্বার্থে বর্তমানে কর্মরত দুজন স্টেশন মাস্টার রাতের বেলা কেঁচি গেট আটকে ভেতরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন, সামান্য ঝুঁকি টের পেলেই যোগাযোগ করতে হচ্ছে স্থানীয় থানায়। স্টেশন মাস্টার খায়রুল ইসলাম জানান, যাত্রীসেবা ও ট্রেন পরিচালনার জন্য তাঁদের সব প্রস্তুতি রয়েছে এবং স্টেশনটিতে ট্রেন থামানো হলে রেলের আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। তবে ট্রেন না থামার টেকনিক্যাল ব্যাখ্যায় পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক জানান, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ৫০ কিলোমিটারের কম দূরত্বে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি দেওয়া দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য জটিলতার সৃষ্টি করে। এছাড়া বর্তমানে পুরো রুটটি সিঙ্গেল লাইনে অতিরিক্ত সক্ষমতায় (ওভার ক্যাপাসিটি) চলছে। তাই আপাতত আন্তঃনগর ট্রেনের বিরতি বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে ডাবল লাইনে উন্নীতকরণের কাজ শেষ হলে এবং নতুন লোকোমোটিভ ও বগি বহরে যুক্ত হলে গুরুত্ব বিবেচনায় এখানে স্টপেজ দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের দাবি-সিন্ডিকেটের মায়াজাল ছিন্ন করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে ৫২ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি নিশ্চিত হবে জনকল্যাণ।