কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে মুক্ত করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) অধীনে নেওয়ার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে একের পর এক কর্মসূচি পালন করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সরকারি প্রজ্ঞাপন না পাওয়ায় আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন তারা। আন্দোলনের নবম দিনে সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে চোখে কালো কাপড় বেঁধে নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শহীদ মিনারের সামনে এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা প্রতীকীভাবে নিজেদের ক্ষোভ ও দাবি তুলে ধরেন। এর আগে রোববার বিকেলে কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সামনে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগকে প্রতীকী লাল কার্ড দেখান শিক্ষার্থীরা। পরে রাতে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। এবং শনিবার রাতে শিক্ষার্থীরা প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দেন। একই রাতে কলেজ ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল করেন তারা। এরও আগে গত সপ্তাহে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এক দফা দাবি
শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে পুরোপুরি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিতে হবে। এ বিষয়ে দ্রুত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির দাবি জানিয়ে আসছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম শাবিপ্রবির অধীনে হলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় দ্বৈত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, এ ব্যবস্থায় বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির স্বকীয়তা, একাডেমিক পরিবেশ ও পেশাগত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিও জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, সেটি সম্ভব না হলে অন্তত শাবিপ্রবির অধীনে নিয়ে ‘ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, সাস্ট’ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ে। ওইদিন শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেন এবং অধ্যক্ষসহ শিক্ষক-কর্মকর্তারা সেখানে আটকা পড়েন। পরে আন্দোলন কয়েক দফা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কলেজ শাটডাউন রাখার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তারা। ৩০ সেপ্টেম্বর নগরের কোর্ট পয়েন্টে অবস্থান ও বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে একটি প্রতিনিধিদল সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে স্মারকলিপি দেয়। কমিশনার তাদের দাবি সম্পর্কে অবগত হয়ে আশ্বস্ত করলেও শিক্ষার্থীরা জানিয়ে দেন, শুধু আশ্বাসে তারা শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন না; দাবি বাস্তবায়নের সরকারি প্রজ্ঞাপন চান তারা।
তিন মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরুর আশ্বাস
আন্দোলনের শুরুতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একাধিক দফা বৈঠক হয়। ২৮ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, আগামী তিন মাসের মধ্যে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনতা থেকে কলেজকে মুক্ত করার উদ্যোগ এবং বিজ্ঞানাগার ও খেলার মাঠের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, এসব আশ্বাসের পরও তাদের মূল দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন।
বাস্তবায়ন হয়নি আগের সিদ্ধান্ত
শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টার নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও কলেজ পরিদর্শনের পর সুপারিশ দেয়। শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, ওই সুপারিশের ভিত্তিতে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে শাবিপ্রবির অধীনে ‘ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, সাস্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
বদলি হলেও থামেনি আন্দোলন
আন্দোলনের মধ্যেই কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আসাদুজ্জামানকে ফরিদপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বদলি এবং ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাহিদ ইকবালকে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীরা এই প্রশাসনিক পরিবর্তনকে তাদের মূল দাবির সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেননি। নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ ড. মো. সাহিদ ইকবাল জানিয়েছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এখন পর্যন্ত কোনো আশ্বাস পাননি। আন্দোলনের কারণে তিনি ক্যাম্পাসে ঢ়ুকতে না পারলেও পরিস্থিতির খোঁজ রাখছেন বলে জানান।
প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন
শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা কোনো ব্যক্তির বদলি বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করছেন না; তাদের মূল লক্ষ্য কলেজের প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাঠামোর স্থায়ী সমাধান। তাই সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে শাবিপ্রবির অধীনে পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।