ভাঙচুর ও অর্থ আত্মসাতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

লায়ন্স ক্লাব ও স্কুল দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান

এফএনএস (মমিনুল ইসলাম রিপন; রংপুর) : | প্রকাশ: ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
লায়ন্স ক্লাব ও স্কুল  দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান

রংপুর লায়ন্স ক্লাব এবং ঐতিহ্যবাহী রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণকাজ, আর্থিক লেনদেন, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব ও সদস্যপদ নিয়ে কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও নথিপত্র চুরির অভিযোগের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের পাল্টাপাল্টি দাবিতে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটির দুটি পক্ষ।

সোমবার (১২ অক্টোবর) নগরের পৃথক দুটি অভিজাত হোটেলে সময় ব্যবধানে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করে নিজ নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করেন মুখোমুখি অবস্থানে থাকা দুই পক্ষের নেতারা। সোমবার সকাল সাড়ে ১১টায় আরকে রোডস্থ হোটেল স্কাই লাউনে আয়োজিত প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এক পক্ষ দাবি করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল ফটক টপকে সশস্ত্র বহিরাগতরা হামলা চালিয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে  ক্লাব পরিচালক লায়ন এনামুল হক সোহেল ও লায়ন এ কে এম বানিউল আদম বাবু অভিযোগ করে বলেন, "গত ১০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে পাঠদান চলাকালে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা বাধা দিলে তাঁদের বেধড়ক মারধর করা হয়।"

বক্তারা আরও জানান, হামলাকারীরা ভবনের ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত লায়ন্স ক্লাবের কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে তাণ্ডব চালায়। আসবাবপত্র ভাঙচুরে প্রায় এক লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয় এবং ঘটনার সত্যতা গোপন করতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পূর্বে গভর্নিং বডির সদস্য ও শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রেক্ষাপটে গত ২১ সেপ্টেম্বর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও প্রশাসন তা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্লাব প্রেসিডেন্ট লায়ন মনজিল মুরাদ লাবলু।

অপরদিকে একই দিন দুপুর দুইটায় হোটেল ক্যাসপিয়ায় আয়োজিত বিপরীত পক্ষের সংবাদ সম্মেলনে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেন ২০২৬-২৭ মেয়াদের দাবিদার প্রেসিডেন্ট লায়ন ফরিদ আহমেদ রুমি ও সেক্রেটারি আকলাকুল ইসলাম তারেক, ট্রেজারার লায়ন শফিকুল ইসলাম স্বপন। অবৈধ ও পদহীন একটি গোষ্ঠী ক্লাব দখল করে রেখেছে উল্লেখ করে তাঁরা শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়মের তথ্য লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরেন। অভিযোগ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের ২৬ শতাংশ জমি ক্রয়ে ৩ কোটি ৬১ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে বাহক চেকের মাধ্যমে ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা নগদায়ন এবং সরকারি গেইন ট্যাক্স ও আয়কর বাবদ ৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত উল্লেখযোগ্য আর্থিক অনিয়মের মধ্যে রয়েছে: উন্মুক্ত দরপত্র বা প্রাক্কলন ব্যতিরেকেই ২২টি চেকের মাধ্যমে ৫ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪৬২ টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে। পিডব্লিউডি (চডউ)-র রেট সিডিউল তোয়াক্কা না করে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫ টাকা এবং ঠিকাদারি লভ্যাংশের ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ১৩৪ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ভবনের নকশা অনুমোদনে কারচুপি এবং সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া ২৭টি শিক্ষক-কর্মচারী পদে মোটা অঙ্কের অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ তোলা হয়।

উত্থাপিত দুর্নীতির প্রতিবাদ করার কারণেই ৬ জন সাবেক সভাপতিসহ মোট ২৯ জন স্থায়ী সদস্যকে বিধিবহির্ভূতভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করেন লায়ন নাজমুল আলম নাজু। কার্যালয়ে হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ফরিদ আহমেদ রুমি বলেন, "অক্টোবর মাসের নিয়মিত সভা শেষে নিয়ম অনুযায়ী নিজের লাগানো তালা দিয়ে আমি চলে আসি। কোনো হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। বরং পদহীন সোহেল ও তাঁর অনুসারীরা উল্টো তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।" বর্তমানে অনিয়ম সংক্রান্ত একটি মামলা (জিআর ৩৯০/২৪) পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) তদন্তাধীন রয়েছে। উভয় পক্ষই নিজেদের বক্তব্যে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ থাকার দাবি জানিয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সুনাম রক্ষায় এবং হামলা ও দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সংক্ষুব্ধ দুই পক্ষের সদস্যবৃন্দ।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে