দিনাজপুরের বীরগঞ্জে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’ শুরু হচ্ছে আগামী ২৩ অক্টোবর। উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসবে ব্যতিক্রমী এ মেলা। স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের কাছে এটি ‘বউ মেলা’ কিংবা ‘বাসিয়াহাট মেলা’ নামে পরিচিত। ঐতিহ্যবাহী এ মেলাকে ঘিরে প্রতিবছরই জমে ওঠে উৎসবের আমেজ। এবারও মেলায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো জীবনসঙ্গী খোঁজার ব্যতিক্রমী আয়োজন। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা আসেন এ মেলায়। তরুণীরা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গয়নায় বউয়ের সাজে সেজে মেলায় হাজির হন। কেউ আসেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, আবার কেউ আসেন একাই। অন্যদিকে তরুণেরাও নতুন পোশাকে নিজেদের পরিপাটি করে মেলায় আসেন। সবার মধ্যেই থাকে পছন্দের মানুষ খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশা।
মেলা প্রাঙ্গণে মাদল ও ধামসার তালে চলে ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান। উৎসবের এই আবহে তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে দেখা ও জানার সুযোগ পান। কারও কাউকে ভালো লাগলে শুরু হয় পরিচয় ও পারস্পরিক পছন্দের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা। পরে উভয় পরিবারের সম্মতি মিললে সামাজিক রীতি মেনে বিয়ের আয়োজন করা হয়। ঢাকঢোল ও সানাইয়ের সুরে সেই বিয়ে হয়ে ওঠে দুই পরিবারের আনন্দ-উৎসব। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ মেলায় পরিচয়ের সূত্র ধরে অনেক তরুণ-তরুণীর বিয়ে হয়েছে। বিয়েতে যৌতুকের প্রচলন থাকলেও কেউ কেউ যৌতুক ছাড়াই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে জীবনসঙ্গী খোঁজার আয়োজনের পাশাপাশি এ মেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষের সামাজিক যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী এ মেলা কেবল কেনাবেচা কিংবা বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর জীবনাচার, সামাজিক রীতিনীতি ও লোকজ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এ আয়োজন ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। আধুনিকতার প্রভাবের মধ্যেও এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন টিকে থাকা স্থানীয় সংস্কৃতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। তাই প্রতিবছর মেলা এলেই গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ হয়ে ওঠে মানুষের মিলনক্ষেত্র। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রত্যাশা সব মিলিয়ে বীরগঞ্জের ‘বউ মেলা’ স্থানীয় জনপদের এক অনন্য আকর্ষণ।