বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এই সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের বিরোধী দলের সহযোগিতা নেয়ার কোনো যোগ্যতা নেই।
আজ রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে ডিআরইউ মিলনায়তনে এবি পার্টি আয়োজিত ‘জুলাই সনদের ১ বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সরকার আলাদা শপথ নেয়ার কথা বলে জাতির সঙ্গে প্রতারণার সূচনা করেছে। তারা বলেছে, সরকারি দল হিসেবে আলাদা শপথ নেবে। এর মধ্য দিয়েই জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। গণভোটের বিষয়টি তুলে ধরে জামায়াতের আমির বলেন, সংসদে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেছেন, গণভোটের চারটি বিষয় তিনি নিজেই বোঝেন না, তাহলে জনগণ কীভাবে বুঝবে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, জনগণ যদি চারটি দফা বুঝতে না পারে, তাহলে ৩১টি দফা কীভাবে বুঝেছে? সরকার জনগণকে মূর্খ মনে করে, অবমূল্যায়ন করে এবং নিজেদেরই কেবল জ্ঞানী মনে করে।
সরকারের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ছাত্ররা প্রথমে রাস্তায় নেমেছিল মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। মেধার ভিত্তিতে রাষ্ট্রে নিজের যোগ্য স্থান নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রকে সেবা দেয়ার সুযোগ তৈরি করাই ছিল তাদের প্রত্যাশা। আর এই সুযোগ নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম হলো সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসি। কিন্তু একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন পিএসসির ওপরও হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এটি কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয়। পিএসসির কোনো সদস্যকে এভাবে দায়িত্ব ছাড়তে বলার অধিকার কোনো মন্ত্রীর নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি চাকরির গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো দলীয় লোকজন দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে শুধু বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের লোকজনের জন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি কোনো এলাকার মানুষ সরকারকে ভোট দেবে কি না, তার ভিত্তিতে সেখানে বরাদ্দ দেয়া হবে কি না, সে ধরনের বক্তব্যও দেয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
রাষ্ট্রীয় অর্থের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজ জন্ম নেয়া শিশু থেকে শুরু করে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষের রাষ্ট্রীয় তহবিলে অংশগ্রহণ রয়েছে। কেউ সরাসরি, আবার কেউ পরোক্ষভাবে অবদান রাখেন। এটি একটি সামষ্টিক তহবিল, যেখানে গরিব মানুষের অর্থ আলাদা করে রাখা হয় না; সব অর্থ এক জায়গায় জমা হয়। তাই এ ধরনের তহবিল নিয়ে রাজনৈতিক বৈষম্যমূলক বক্তব্য দেয়া শুধু অশালীনতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারি দলের এমপিদের ২০৮টি আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, অথচ বিরোধী দলের একজন এমপিকেও তা দেয়া হয়নি। এই বৈষম্যের জন্যই কি এতগুলো জীবন গেছে, এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল পরিবর্তনের জন্য। পুরোনো রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হবে বলে জনগণ আশা করেছিল। কিন্তু দেশকে আবারও আগের ধারায় ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মহিষের ওপরও কর আরোপের প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। তার বক্তব্যে মহিষের ঘাস খাওয়ার জন্যও টাকা দেয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। বিরোধী দলের আন্দোলন নিয়ে সরকারের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, বিরোধী দল কেন সহযোগিতা না করে আন্দোলন করছে এবং কেন আন্দোলন দীর্ঘায়িত করছে, এমন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কিছু কথিত সুশীল ও বুদ্ধিজীবীও একই ধরনের বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করছে।
আগের স্বৈরাচারী সরকারের পথেই বর্তমান সরকার হাঁটছে বলে অভিযোগ করে জামায়াত আমির বলেন, বিরোধী দল চুপচাপ বসে থাকবে না। নানা ধরনের কারসাজি ও অনিয়মের পর জনগণ তাদের যে কয়টি আসন দিয়েছে, সেই আসনে থাকা সংসদ সদস্যরা সারা দেশের ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় পাহারাদার হিসেবে কাজ করবেন, ইনশাআল্লাহ। তিনি বলেন, বিএনপি বদলে গেলেও আমরা নিজেদের কথা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় আদায় না করা পর্যন্ত আমরা থামবেন না। আমাদের বিভিন্ন ধরনের লোভ-লালসা দেখানো হয়েছে। তবে সেসব প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি।
জাতির সঙ্গে প্রতারণার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিরোধী দল হিমালয় পর্বতের মতো অটল থাকবে বলে ঘোষণা দেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট দলের জন্য নয়। জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ করা, বৈষম্যহীন সমাজকাঠামো গড়ে তোলা, মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তোলাই এই আন্দোলনের লক্ষ্য।