গাইবান্ধায় সড়ক জুড়ে অটোরিকশার নৈরাজ্য: জীবিকার বাহন এখন জনদুর্ভোগের কারণ

এফএনএস প্রতিবেদক : | প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৯ এএম
গাইবান্ধায় সড়ক জুড়ে অটোরিকশার নৈরাজ্য: জীবিকার বাহন এখন জনদুর্ভোগের কারণ

শহরের মূল সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, স্কুল-কলেজের সামনের সড়ক কিংবা হাট - বাজার সবখানেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। বেপরোয়া চলাচল, উল্টো পথে প্রবেশ, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা এবং সড়কের ওপর অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে যানজট। একই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শহরবাসী।স্থানীয়দের ভাষায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন গাইবান্ধার সড়কে নতুন আতঙ্কের নাম। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে এসব যানকে ‘বাংলার টেসলা’ বলছেন। তবে নামের এই রসিকতার আড়ালে রয়েছে সড়কে শৃঙ্খলা ভঙ্গ, পথচারীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের ভোগান্তি।গাইবান্ধা পৌর শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, একাধিক অটোরিকশা পাশাপাশি চলাচল করছে। পেছন থেকে অন্য যানবাহন হর্ন দিলেও অনেকে সড়ক ছেড়ে দিতে চান না। আবার যাত্রী পাওয়ার আশায় মোড়ের ওপর কিংবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো চালক একমুখী সড়কেও উল্টো দিক দিয়ে প্রবেশ করছেন। এতে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।গাইবান্ধা পৌরসভার মোটরযান লাইসেন্স শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায় গাইবান্ধা জেলায় ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে নিবন্ধিত মোট অটো রিকশার সংখ্যা মাত্র ১৮৮১ টি । অথচ সড়কে প্রায় ৪ হাজারের বেশি অবৈধ অটোরিকশা চলাচল করছে । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌর সভার এক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, "রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বর্তমানে জেলায় অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা বেড়েছে । আগে নিয়মিত ধরপাকড় করে লাইসেন্সের আওতায় আনা হতো কিন্তু এ বছর কোন অভিযান চালানো হয়নি ফলে নিবন্ধিত অটোরিকশার চেয়ে অনিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা বেশি। " সম্প্রতি গাইবান্ধা শহরের ডিবি রোডে দেখা যায় সড়কজুড়ে ইজিবাইকের নৈরাজ্য। গাইবান্ধা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে পার্ক মোড় পর্যন্ত সড়কটি দিনের বেশিরভাগ সময় তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে। ডিবি রোডে চলাচলকারী রাসেল আহমেদ নামের এক বাইকার জানান," প্রতিদিন কাজে বের হলে অটোরিকশার কারণে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো হয়। পেছন থেকে গাড়ি এলেও অনেক চালক খেয়াল করেন না। এতে কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে, সেই আতঙ্কে চলতে হয়।"সিমান্ত সরকার নামে আরেক ট্রাক চালক জানান" অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেও যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়। অটোরিকশাগুলো নিয়ম মেনে চললে এবং নির্দিষ্ট স্থানে যাত্রী ওঠানামা করলে যানজট অনেকটাই কমে আসতে পারে। কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা না থাকায় প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।" এদিকে শহরের অলিগলি দখলের পাশাপাশি ইজিবাইক গুলো দখলে নিয়েছে গাইবান্ধার বিভিন্ন মহাসড়ক। যেখানে প্রতিনিয়ত বাস ট্রাক চলাচল করছে । অদক্ষ অটো চালকদের কারনে মাঝে মধ্যেই ঘটছে দূর্ঘটনা। সড়কে শৃঙ্খলা নষ্ট করা এসব অবৈধ যানবাহনের নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রশাসনের কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ে না তাই দিন দিন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এসব যানবাহন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা‌‌ জেলার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আলতাব হোসেন জানান, " ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বেশ কিছু আইনগত সীমাবদ্ধতা আছে ফলে অন্য সকল মোটরচালিত যানবাহনের মতো ইজিবাইকের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া কঠিন। এরপরও ট্রাফিক পুলিশ শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গুলোতে যানযট নিরসনে কাজ করছে " তবে অটোরিকশাচালকদের একটি অংশের দাবি, যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা এ পেশায় যুক্ত হয়েছেন। শহরে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও যাত্রী ওঠানামার জায়গা পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক সময় সড়কের পাশে গাড়ি রাখতে হয়। গাইবান্ধা ইজিবাইক চালক সমিতির জেলা কমিটির আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী জানান " বর্তমানে গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ২০ হাজারের মতো অটো রিকশা আছে । প্রতিদিন রাস্তায় নতুন অটো নামছে । মোটরচালিত যানবাহনের মতো লাইসেন্স করতে হয়না বলে এটি সহজেই কেনা যায় তাই অনেক বেকার লোকজন একটু ভালো আয়ের আশায় অটো কিনছে । সরকার যদি ইজিবাইক চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ ও স্বল্পমূল্যে ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে চালকদের মধ্যে শৃঙ্খলা আসবে। " নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের গাইবান্ধা কমিটির নেতা মাহমুদ হাসান লিটন জানান, " সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে ।এসব যানবাহনের চালকদের বড় একটি অংশ সড়কে নূন্যতম ট্রাফিক আইন মানছে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উদাসীন মনোভাবের কারণে অটো রিকশা এখন সড়ক মহাসড়কের বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। এটি যেহেতু হাজার মানুষের জীবিকার অবলম্বন তাই অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করার দাবি নয়, বরং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।"

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে