সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত নিরাপদ খাদ্য। অথচ প্রতিদিনের খাবার কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। চাল, ডাল, মাছ, মাংস, শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল, দুধ, ভোজ্যতেল ও লবণ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মান নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে রয়েছে নানা প্রশ্ন। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ শিশুদের জন্য তৈরি বিস্কুট, পাউরুটি, চিপসসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে নীলফামারীতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ও তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে পণ্য কিনতে গিয়ে কোনটি নিরাপদ আর কোনটি ভেজাল বা দূষিত, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। দেখতে টাটকা মাছ, মাংস ও সবজি কিংবা আকর্ষণীয় রঙের ফলমূল কিনেও সেগুলোর গুণগত মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ফলে প্রতিদিনের খাবার গ্রহণের মধ্য দিয়েই মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন কি না, সেই উদ্বেগ বাড়ছে। বাজারে বিক্রি হওয়া কলা, পেঁপে, কমলা, আপেল ও আঙুরের মতো ফলমূলের উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পাকানোর পদ্ধতি নিয়েও ভোক্তাদের মনে প্রশ্ন রয়েছে। একইভাবে মিষ্টি, দই, জিলাপি ও রসমালাই তৈরিতে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় পরিবেশিত বিরিয়ানি ও রান্না করা মাংসের উপকরণ, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাবার তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। শিশুদের খাদ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বেশি। রুটি, বিস্কুট, পাউরুটি, চিপসসহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবারের উপাদান, উৎপাদনের পরিবেশ, মেয়াদ ও সংরক্ষণব্যবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কারণ, শিশুদের জন্য অনুপযোগী বা দূষিত খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া সয়াবিন তেল, লবণ ও দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিশুদ্ধতা নিয়েও ভোক্তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। খাদ্যপণ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিকের অননুমোদিত ব্যবহার, জীবাণুদূষণ কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন ও সংরক্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত বাজার তদারকি ও পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থারও দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু নীলফামারীর বাজারগুলোতে নিয়মিত অভিযান, খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা কিংবা জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করতে হবে। অনিয়ম শনাক্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষার ফলাফল ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করাও জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন, ভেজালবিরোধী অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। একই সঙ্গে খাদ্য ব্যবসায়ীদের আইন মানতে বাধ্য করা এবং ভোক্তাদের অভিযোগ দ্রুত তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। নীলফামারীর সৈয়দপুরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ কেবল দাপ্তরিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি জোরদার করবে। কোন খাদ্য নিরাপদ আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করে অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ, নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই সৈয়দপুর বাজারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।