ফুটবল মাঠে অসাধারণ সব কীর্তির স্বীকৃতি এবার স্পেনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে। আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসির হাতে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস পুরস্কার তুলে দিয়েছেন স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্সেস লিওনর। বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে কাজ করার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে। পুরস্কারের জন্য মেসিকে নির্বাচিত করে জুরিবোর্ড তাঁকে আখ্যা দিয়েছে ‘সর্বকালের সবচেয়ে সফল ফুটবলার’ হিসেবে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) উত্তর স্পেনের আস্তুরিয়াস অঞ্চলের রাজধানী ওভিয়েদোর ক্যাম্পোয়ামার থিয়েটারে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়। সেখানে মেসিকে ঘিরে ছিল উৎসবের আবহ। আর্জেন্টিনার জার্সি পরা সমর্থকেরা তাঁর নাম ধরে উল্লাস করেন। ব্যাগপাইপ ও ড্রামের বাদ্যের মধ্যে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান ৩৯ বছর বয়সী এই ফুটবল তারকা। স্পেনে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে কয়েক দিন ধরেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেসিকে ঘিরে এই উন্মাদনা ২০২৩ সালে হলিউড অভিনেত্রী মেরিল স্ট্রিপের সফরকেও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রিন্সেস লিওনরের হাত থেকে পুরস্কারের সনদ গ্রহণ করেন মেসি। তাঁর নামে পুরস্কারটির নামকরণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে লিওনর মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ার, খেলার প্রতি তাঁর দক্ষতা এবং দলীয় চেতনাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রশংসা করেন।
প্রিন্সেস লিওনর বলেন, “জানি না আর কোনো কিংবদন্তি সবাইকে একই অনুভূতিতে গাঁথতে পেরেছেন কি না। একটি মুহূর্তে, গোলের জন্য সবাই যখন অপেক্ষা করে, তখন সবাইকে এক সূত্রে গাঁথা হয়ে যেতে দেখা যায়। এ কারণেই মেসির দিকে এবং তাঁর অতুলনীয় ক্যারিয়ারের দিকে তাকানো অর্থবহ।”
বক্তৃতায় স্পোর্তিং গিহনের এক সাবেক খেলোয়াড়ের বক্তব্যও তুলে ধরেন তিনি। সেই খেলোয়াড়ের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর ভাষ্য উদ্ধৃত করে লিওনর বলেন, মেসি মুহূর্তের ভগ্নাংশের মধ্যেই সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে দলগত চেতনাকে প্রাধান্য দেন।
২০২৬ সালের জুনে মেসিকে ক্রীড়া বিভাগে পুরস্কারজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর অসাধারণ ফুটবল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরে জুরিবোর্ড। লিও মেসি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে তাঁর কাজও এ স্বীকৃতির অন্যতম কারণ।
শুক্রবার একই অনুষ্ঠানে অন্য পুরস্কারজয়ীদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিটিশ লেখক জুলিয়ান বার্নস, মার্কিন মহাকাশচারী ক্রিস্টিনা কোচ এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী প্যাটি স্মিথ। ক্রীড়া বিভাগে এর আগে পুরস্কার পেয়েছেন টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস ও রাফায়েল নাদাল, ম্যারাথন দৌড়ের রেকর্ডধারী এলিউড কিপচোগে এবং মার্কিন স্কিয়ার লিন্ডসে ভন।
বার্সেলোনা ছাড়ার পর দুই মৌসুম ফ্রান্সের প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ে খেলেন মেসি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন। তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকায় রয়েছে আটটি ব্যালন ডি’অর, একটি বিশ্বকাপসহ ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য শিরোপা। আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ গোল, অ্যাসিস্ট ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তাঁর দখলে বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এএফপি জানিয়েছে, চলতি বছরের বিশ্বকাপ ফাইনালে নিউ জার্সিতে স্পেনের কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথাও সামনে এসেছে। তবে ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন এই তারকা।
মেসির ফুটবলজীবন ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেন স্পেন কোচ। তিনি বলেন, “খেলাধুলা ও ফুটবলে মেসি যে ঐতিহ্য রেখে যাচ্ছেন, তা ব্যতিক্রমী। একজন মানুষ ও খেলোয়াড় হিসেবে তিনি বহু মূল্যবোধের এক অসাধারণ উদাহরণ।”
গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের পরও মেসির খেলার মান ও তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
পুরস্কার পাওয়ার পর ইনস্টাগ্রামে নিজের অনুভূতি জানান মেসি। তিনি লেখেন, “ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রিন্সেস অব আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড পাওয়াটা দারুণ সম্মানের। সব পুরস্কারজয়ীকে অভিনন্দন। আপনাদের সবার সঙ্গে দেখা হয়ে দারুণ সময় কেটেছে।”
মাঠের সাফল্য, দলীয় চেতনা এবং সামাজিক কাজে অবদানের স্বীকৃতি মিলিয়ে মেসির অর্জনের তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা। স্পেনে তাঁর এই সফর আবারও দেখিয়েছে, বার্সেলোনার হয়ে দীর্ঘ সময় খেলা এই আর্জেন্টাইন তারকার প্রতি দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের আবেগ এখনো কতটা গভীর।