ফসলি জমির টপসয়েল যাচ্ছে ইটভাটায়, কমছে জমির উর্বরতা শক্তি

মোঃ হায়দার আলী | প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:০২ পিএম
ফসলি জমির টপসয়েল যাচ্ছে ইটভাটায়, কমছে জমির উর্বরতা শক্তি
মোঃ হায়দার আলী

বাংলাদেশ পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৬৪.৬ মিলিয়ন মানুষের বসবাস। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ০.৫৪ শতাংশ চাষযোগ্য কৃষিজমি বিভিন্ন অবকাঠামো, দু-ফসলি কৃষিজমিতে ব্যাপকহারে পুকুর খনন, বসতবাড়ি, কল-কারখানা ইত্যাদি নির্মাণের দরুন অকৃষি জমিতে রূপান্তর হচ্ছে। ফলে দেশের প্রধান খাদ্য ‘চালের’ ক্ষতি হচ্ছে ০.৮৬ থেকে ১.১৬ শতাংশ। আবাদি জমি হ্রাস পাওয়ায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটানো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেমন-উচ্চফলনশীল জাতের উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, আধুনিক নালা (ড্রেন) নির্মাণ, দু-ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে পরিণত করা।

বিভিন্ন স্থানে জমির টপসয়েল বেশি লাভের আশায় কৃষক ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। কথিত জমি সমতল করার জন্য টপসয়েল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে সমতল করা হচ্ছে। তিন/দু-ফসলি জমিতে ব্যাপকহারে পুকুর খনন করে মাছ চাষের নাম অপরিকল্পিতভাবে সার, কীটনাশক প্রয়োগের ফলে ফসলের উপকারী জীবাণু মরে যাচ্ছে।

জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত চাষাবাদ, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং মাটিতে জৈব পদার্থের অভাব। মাটির উর্বরতা শক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা-এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উত্তরের ১৬ জেলাসহ দেশে অপরিকল্পিত ও অসম রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরাশক্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে মাটির উর্বরাশক্তি ও মাটিতে অম্লত্বের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বনিম্ন আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে জৈব পদার্থের উপস্থিতি।

এ কারণে মাটিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করলেও তা ফসল উৎপাদনে কাজে লাগছে না। আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ সারেরও আর্থিক অপচয় হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সমন্বিত উদ্যোগ।

রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কার্যালয়ের গবেষণা রিপোর্টে এমন আশঙ্কাজনক তথ্য পাওয়া গেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মাটির উর্বরাশক্তি ক্রমাগত নষ্ট হয়ে মাটি ভারসাম্য হারাচ্ছে। এর ফলে মাটির উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমাগত নিম্নগামী হচ্ছে।

মৃত্তিকা গবেষকদের মতে, এতে কৃষক জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তার ফসলের ফলন পাচ্ছেন না। বেড়ে যাচ্ছে ফসল উৎপাদন ব্যয়। শুধু তাই নয়, মাটির উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে। মাটিতে মিশে থাকা ফসল উৎপাদনের অণুজীবগুলোও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষি ব্যবস্থায় মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের গবেষকরা।

দেশের ঢাকা কৃষি খামারবাড়ি সড়কে মৃত্তিকা ভবনে স্থাপিত মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের কেন্দ্রীয় মাটি পরীক্ষা গবেষণাগারসহ দেশে বর্তমানে ৩৯টি মাটি পরীক্ষা গবেষণাগার রয়েছে।

এছাড়া বেশ কিছু ভ্রাম্যমাণ মৃত্তিকা গবেষণাগার রয়েছে। এসব গবেষণাগারের তথ্যমতে, শুধু রংপুর-রাজশাহী বিভাগের ১৬ জেলা নয়। এই মাটির উর্বরাশক্তির (গঠন প্রণালিতে মিশ্রিত জৈব, খনিজসহ অন্যান্য উপাদান) উপস্থিতি সর্বনিম্ন উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের মোট খাদ্যশস্যসহ সব ফসল উৎপাদনের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে আশঙ্কা করেছেন মাটি নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, এমন গবেষকরা।

এসব গবেষণাগারে মাটি পরীক্ষার সারা দেশের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক বলে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের রংপুর বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, তারা সারা দেশের মাটি নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকাস্থ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষণা রিপোর্টে এমন তথ্য পেয়েছেন।

এ অবস্থার পরিবর্তন করা না গেলে দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য অশনিসংকেত বলে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা মনে করছেন। এজন্য মাটিতে সুষম সার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এজন্য ব্যাপক প্রচারণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন মাটি গবেষকরা।

রংপুর বিভাগের ৫ জেলার ৩৮টি উপজেলা থেকে সংগৃহীত মাটি পরীক্ষা করে রংপুর মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা মাটির এ পরিস্থিতি পরিলক্ষিত করেন।

মাঠ পর্যায় থেকে রংপুর বিভাগীয় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের গবেষক দল যে মাটি পরীক্ষায় দেখছেন, দেশের কৃষি উপযোগী মাটির মারাত্মক রাসায়নিক ও জৈবিক গুণগত পরিবর্তন ঘটছে।

এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে, গঠন প্রণালি ভেঙে যাচ্ছে এবং ফসল উৎপাদনের জন্য উর্বরাশক্তি ও ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ভূমিক্ষয় প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতি মাটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। মাঠে অধিক ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ, উৎপাদন কমে যাওয়া, ধানগাছে চিটাসহ নানা প্রকার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কৃষকের উৎপাদিত ফসলে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি সূত্রমতে, মাটিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাসিয়াম, গন্ধক, দস্তা, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, বোরন, মলিবডেনাম, লৌহ, ম্যাঙ্গানিজ, তামা, ক্লোরিন ও জৈব উপাদানসমূহ সঠিক মাত্রায় থাকা দরকার। অর্থাৎ এসব উপাদান ফসল উৎপাদনের জন্য একান্ত অপরিহার্য।

মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে এবং মাটির চাহিদা অনুপাতে কৃষকদের জমিতে সার প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে যেমন কৃষক সন্তোষজনক ফলাফল পাবেন, তেমনি অনুমাননির্ভর সার প্রয়োগের ফলে মাটির গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে এবং ফসল উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এ চিত্র শুধু উত্তরের জেলাগুলোতে নয়, এমন আশঙ্কাজনক মাটির পরিস্থিতির চিত্র সারা দেশের।

রংপুর বিভাগের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশে অন্তত ২০ প্রকার রাসায়নিক সার বৈধ ও অবৈধভাবে আসছে এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে কৃষকরা ৭টি রাসায়নিক সারের সঙ্গে বেশি পরিচিত। তারা যেসব সার জমিতে ব্যবহার করে থাকেন।

সেসব সারের মধ্যে রয়েছে ইউরিয়া (নাইট্রোজেন), মলিবডেনাম, ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস, বোরন, পটাশিয়াম ও গন্ধক। এসব সার কৃষকরা অনুমাননির্ভর ব্যবহার করে থাকেন। ফলে মাটিতে পরিমিত পর্যায়ে বা সুষমভাবে মাটিতে সারের প্রয়োগ হচ্ছে। অথচ মাটির জন্য এটি অপরিহার্য।

দেশের কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত, এ রকম কৃষকদের প্রায় ৮০ ভাগই অশিক্ষিত। তারা জমিতে অনুমাননির্ভর রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন। তাই মাটির এই পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।

গবেষণা রিপোর্টের তথ্য থেকে জানা গেছে, গাছ মাটি থেকে ১৬ প্রকার খাদ্য উপাদান গ্রহণ করে। এর মধ্যে একটি গাছ ১৩ প্রকার খাদ্য উপাদানই সংগ্রহ করে মাটি থেকে।

দেশের কৃষি উপযোগী জমির মাটি পরীক্ষার গবেষণা রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে ৯ ধরনের উপাদান মাটিতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, মাটিতে অন্ততপক্ষে জৈব পদার্থের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন, শতকরা ৫ ভাগ, তা রয়েছে মাত্র শতকরা ১ থেকে ২ ভাগ। মাটিতে পিএইচ (অম্লত্ব) থাকা উচিত কমপক্ষে শতকরা ৬ থেকে সাড়ে ৭ ভাগ। সেখানে রয়েছে শতকরা দশমিক ৪ থেকে সাড়ে ৫ ভাগ। অম্লত্ব কমে গেলে মাটিতে অদ্রবণীয় অদৃশ্য আবরণ তৈরি হয়, ফলে বিশেষ করে টিএসপি (ফসফরাস) সার প্রয়োগ করলে তা উৎপাদিত ফসলের কাজে আসে না। সেটি মাটিতে থাকা ফসল গ্রহণ করতে পারে না। এ কারণে কৃষক কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফসল পায় না। ফসলের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়।

শুধু তাই নয়, এই আমদানিনির্ভর সারের প্রয়োগ বেশি মাত্রায় দিতে গিয়ে টিএসপি সারের চাহিদা বেড়ে যায়। যা ফসলের জমিতে প্রয়োগ করলেও কাজে আসে না।

যেখানে মাটিতে নাইট্রোজেন থাকা উচিত শতকরা শূন্য দশমিক ২৭ থেকে শূন্য দশমিক ৩৬ ভাগ, সেখানে রয়েছে মাত্র শতকরা দশমিক ০৯ থেকে শূন্য দশমিক ১৮ মাত্রা পর্যন্ত। একইভাবে সালফার থাকা প্রয়োজন শতকরা ২২ দশমিক শূন্য ৫ থেকে ৩০ পর্যন্ত। সেই মাত্রাও সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

কেঁচো মাটি খেয়ে উপরের স্তরের মাটি নিচে ও নিচের স্তরের মাটি উপরে আনে; যা কৃষকের জন্য সুফল বয়ে আনে। বাংলাদেশে প্রায় ২০ প্রজাতির ব্যাঙ রয়েছে, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ব্যাঙের বংশবৃদ্ধি কমেছে।

এছাড়া এখন গবাদিপশুর বর্জ্য এবং বিভিন্ন গাছপালা পচনের পর যে জৈব উপাদান মাটিতে এক সময় কৃষকরা ব্যবহার করত। তা এখন ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে মাটিতে জৈব উপাদান ক্রমাগত কমে যাচ্ছে।

জমির উর্বরতা শক্তি কমে যাচ্ছে। জমির উর্বরতা কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত চাষাবাদ, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং মাটিতে জৈব পদার্থের অভাব। মাটির উর্বরতা শক্তি ও উৎপাদন ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে।

জৈব সার ব্যবহার: মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি মেটাতে গোবর সার, কম্পোস্ট বা কেঁচো সার (ভার্মিকম্পোস্ট) নিয়মিত প্রয়োগ করতে হবে।

সবুজ সার উৎপাদন: ধইঞ্চা বা শণজাতীয় গাছের চাষ করে গাছগুলো ছোট থাকা অবস্থায় মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটির উর্বরতা ও নাইট্রোজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

কৃষি তথ্য সার্ভিস শস্য পর্যায় (ঈৎড়ঢ় জড়ঃধঃরড়হ) মেনে চলা: একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে পর্যায়ক্রমে ভিন্ন ভিন্ন ফসল (যেমন-ধানের পর ডাল বা তেলবীজ) চাষ করতে হবে।

মাটি পরীক্ষা: জমিতে আন্দাজে সার না দিয়ে, উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।

ভূমিক্ষয় রোধ: মাটির উপরিভাগ সাধারণত ৭"-৮" ইঞ্চি গভীরতা পর্যন্ত ফসলের পুষ্টি উপাদান থাকে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, পানি প্রবাহ, বাতাসের গতিরোধ ইত্যাদি কারণে উপরিভাগের মাটি স্থানান্তরিত হওয়ার ফলে সঞ্চিত পুষ্টি উপাদান বিনষ্ট হয়ে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়। তাই বৃষ্টি ও বন্যার পানি গড়ানোর সময় যাতে জমির উপরিভাগের মাটি অপসারিত না হয় এবং নালা ও খাদের সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব নিয়ন্ত্রণ: মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব অতিরিক্ত বেড়ে গেলে উর্বরতা হ্রাস পায় এবং ওই অবস্থায় অনেক খাদ্যোপাদান ফসলের গ্রহণ উপযোগী হয় না। তাই প্রয়োজনে জৈব সার প্রয়োগে অম্লত্ব-ক্ষারত্ব কমাতে হবে।

সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ: ফসল পুষ্টির জন্য মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান গ্রহণ করে বিধায় বিভিন্ন ফসল আবাদের ফলে মাটির উর্বরতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। বিভিন্ন ফসল মাটি থেকে বিভিন্ন পরিমাণে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে থাকে। তাই ঘাটতি পূরণের জন্য জমিতে জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বয়ে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা উচিত।

জৈব পদার্থ ব্যবহার: মাটির ভৌত ও রাসায়নিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য জৈব পদার্থের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি উদ্ভিদের খাদ্যোপাদান সরবরাহ, মাটির অম্ল ও ক্ষারত্বের তারতম্য রক্ষা এবং রাসায়নিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। তাই জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোবর সার, কম্পোস্ট, খামারজাত সার ইত্যাদি প্রয়োগ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণের প্রচেষ্টা নেওয়া উচিত। সবুজ সার ও বিভিন্ন ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে মিশিয়ে জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আদর্শ মাটিতে কমপক্ষে ৫% জৈব পদার্থ থাকা উচিত। কিন্তু আমাদের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ খুবই কম। সুতরাং যত বেশি পারা যায় জমিতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। জমির হিউমাস ও উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধির জন্য যা করা যেতে পারে।

ডালজাতীয় ফসলের চাষ: বিভিন্ন ধরনের ফসল মাটি থেকে অধিক পরিমাণ নাইট্রোজেন গ্রহণ করে। ফলে মাটিতে দ্রুত এর অভাব দেখা দেয়। জমিতে মাঝে মধ্যে ডালজাতীয় ফসলের চাষ করে এ ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা যায়। কারণ এগুলোর শিকড়ের শুঁটিতে রাইজোবিয়াম নামক ব্যাকটেরিয়া বসবাস করে এবং বায়ু থেকে নাইট্রোজেন আহরণপূর্বক গুটিতে সঞ্চয় করে ও পরিণামে মাটির উর্বরতা বাড়ায়।

জমিকে বিশ্রাম দেওয়া: দীর্ঘদিন ধরে কোনোরূপ বিশ্রাম ছাড়া নিবিড় চাষাবাদ করা হলে মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব গুণাবলির অবনতি ঘটে। তাই কয়েক বছর পর অন্তত এক মৌসুমের জন্য জমি পতিত রেখে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। অবশ্য এ সময়ে জমিতে সবুজ সারের চাষ বা নিয়মিত পশু চারণের ব্যবস্থা করলে ভূমির উর্বরতা আরও বৃদ্ধি পায়।

উপযুক্ত শস্য বিন্যাস অনুসরণ: জমিতে প্রতি বছর একই ফসল বা একই ধরনের ফসলের চাষ করলে একটি নির্দিষ্ট স্তরের নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান নিঃশোষিত হয়ে উর্বরতা বিনষ্ট হয়। তাই পর্যায়ক্রমে গুচ্ছমূলজাতীয় ফসলের পর প্রধানমূলজাতীয় ফসল, একবীজপত্রী ফসলের পর দ্বিবীজপত্রী ফসল এবং অধিক খাদ্য গ্রহণকারীর পর অল্প খাদ্য গ্রহণকারী ফসল আবাদ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করা যেতে পারে। মাটি, প্রভৃতি এবং ভৌগোলিক অবস্থানভেদে উপযুক্ত শস্য বিন্যাস অনুসরণ করতে হবে।

চাষাবাদ পদ্ধতির উন্নয়ন: ত্রুটিপূর্ণ চাষাবাদ পদ্ধতি মাটির উর্বরতা বিনষ্ট করে। কিন্তু উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে ভূমির উর্বরতা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা সম্ভব। জমি সব সময় একই গভীরতায় কর্ষণ করলে ওই গভীরতার নিচে একটা শক্ত স্তরের সৃষ্টি হয় এবং ওই স্তরের নিচ থেকে খাদ্যোপাদান আহরণ করতে পারে না। তাই ভূমি কর্ষণের গভীরতা ও অন্যান্য আবাদ প্রক্রিয়া মাঝে মাঝে পরিবর্তন করা উর্বরতা সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক।

সুষ্ঠু পানি সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা: সুষ্ঠু সেচ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে মাঠের উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জমিতে পরিমিত সেচ দেওয়া ও অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন।

ক্ষতিকারক রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন: মাটিতে অনেক সময় ক্ষতিকর রোগ ও কীটের জীবাণু বা ডিম থাকে এবং ফসল উৎপাদনকালে সেগুলো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। পর্যায়ক্রমে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে জমি চাষ করলে এবং মাটি রোদে শুকিয়ে নিলে সেগুলো বিনষ্ট হয়ে যায় এবং মাটির উন্নয়ন সাধিত হয়। প্রয়োজনে সঠিক সময়ে সঠিক কৌশলে উপযুক্ত বালাইনাশক ব্যবহার করতে হবে।

আগাছা দমন: আগাছা মাটি থেকে খাবার গ্রহণপূর্বক ভূমির উর্বরতা খর্ব করে ও শস্য উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই জমিতে কখনও আগাছা জন্মাতে না দেওয়া ও সর্বদা পরিষ্কার রাখা আবশ্যক।

মৃত্তিকা জীবাণু সংরক্ষণ: মাটিতে অসংখ্য হিতকর জীবাণু থাকে এবং এরা ফসফরাস, লৌহ প্রভৃতি অদ্রবণীয় পদার্থসমূহকে পানিতে দ্রবণীয় পদার্থে রূপান্তর ও বায়ু থেকে মাটিতে নাইট্রোজেন সংযুক্ত করে ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। তাই মাটিকে এমনভাবে পরিচর্যা করা দরকার যেন মৃত্তিকা জীবাণুসমূহের বসবাসের পরিবেশ সমুন্নত থাকে।

পাক মাটি ও বোঁদ মাটি ব্যবহার: সাধারণত বৃষ্টিপাত ও বন্যার পানির সঙ্গে মাটির উপরিভাগের পুষ্টি উপাদান ও জৈব পদার্থ অপসারিত হয়ে পথিমধ্যে পুকুর, ডোবা, নালা প্রভৃতির তলদেশে জমা হয়। এভাবে জমাকৃত মাটিকে পাক মাটি বা বোঁদ মাটি বলে এবং এটা খুবই উর্বর হয়। শুষ্ক মৌসুমে ওই মাটি কেটে আবাদি জমিতে মিশিয়ে দিলে মাটির উৎকর্ষ সাধিত হয়। তাই ফসল আবাদের লক্ষ্যে উপরিউক্ত ব্যবস্থাদি গ্রহণের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ভীতিকর। গবেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রক্রিয়ায় ২০৬০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান ফসলগুলোর ফলন ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনার জন্য বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা সুপারিশকৃত নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে টেকসই মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা গেলেই কেবল বৈশ্বিক পরিবর্তিত জলবায়ুর বিরূপ প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।

লেখক: প্রধান শিক্ষক, মহিশালবাড়ী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়