খুলনায় ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত একের পর এক কর্মসূচি দেওয়া হবে। প্রয়োজনে খুলনা থেকে ঢাকায় যাওয়ার ডাক দেওয়া হলে গ্রাম-বাংলার মানুষকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়ারও আহ্বান জানান তিনি। শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে খুলনার শিববাড়ি মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্যের ৭ দফা দাবিতে লংমার্চের সমাবেশে বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের দাবিগুলো কোনো দলীয় বা নির্বাচনী দাবি নয়; বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিকের দাবি। জুলাই গণহত্যাসহ গত সাড়ে ১৫ বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, চাঁদাবাজি বন্ধ, অর্থ পাচার রোধ এবং কৃষকের সার নিশ্চিত করার দাবিতে আমরা মাঠে নেমেছি। সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমীর বলেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এখন গণভোটের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কার্ড বিতরণের প্রচার করা হলেও সাধারণ মানুষ এর সুফল পাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। একই সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলের মাধ্যমে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ তৈরির অভিযোগ করেন।
কৃষকের সার সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নিয়োগ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এসব অনিয়ম বন্ধ করে কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ১১ দলের বিজয় নয়, তারা চান দেশের প্রতিটি নাগরিকের বিজয় ও মুক্তি। শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। জাতির সঙ্গে বেইমানি না করার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেন না, কোনো আপসও করবেন না।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা:
শফিকুর রহমান খুলনাবাসীর উদ্দেশ্যে আরও বলেন, ‘কথা দিয়ে যাচ্ছি, জীবন যাবে তবু জাতির সঙ্গে বেইমানি করব না ইনশাআল্লাহ। আপনারা শুধু দোয়া করবেন, জাতির জন্য লড়াই করতে করতে আল্লাহ যেন শহীদ হিসেবে কবুল করেন। মাঝখানে কোনো আপস নাই। আপস করতে জানি না। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করতে জানি না।’ তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। বরং আন্দোলন কর্মসূচি একের পর এক আরও শক্তিশালী হবে। প্রয়োজনে খুলনা থেকে ঢাকায় যাওয়ার ডাক দেওয়া হলে গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘর থেকে মানুষ সেখানে হাজির হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। খুলনা মহানগরী জামায়াতের আমির মুহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান।
অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযাহার চৌধূরী, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বেলাল হোসেন নেয়াজী, ঢাকা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির সেলিম উদ্দিন এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, এনসিপির আবদুল হান্নান মাসউদ এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম আহবায়ক মাওলানা হুসাইন আকন্দ, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, ঢাবি'র জিএস এস এম ফরহাদ, চবি'র ভিপি ইব্রাহিম রনি, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত উল্লাহ টুটুল, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ খান প্রধান, জাতীয় নাগরিক কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, জনগণের সাত দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তাঁরা রাজপথে নেমেছেন। এসব দাবি কোনো দল বা জোটের নিজস্ব দাবি নয়, বরং দেশের মানুষের বাঁচা-মরার দাবি। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। দাবি আদায় করেই তাঁরা ঘরে ফিরতে চান।
গণভোটের রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে যারা ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে তা বাস্তবায়নের কথা বলেছিলেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাঁরাই এখন সেই রায় মানতে চাইছেন না। তাঁর অভিযোগ, গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে মত দিলেও সংসদে সেই রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি করা হচ্ছে। এখন ক্ষমতায় বসে আগের মতো দেশ পরিচালনার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কার্ডের মাধ্যমে এক হাজার, দেড় হাজার বা দুই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অথচ গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ না করেও বিল নেওয়া হচ্ছে, বিদ্যুৎ না পেলেও বিল দিতে হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে জনগণের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। কৃষকের সারসংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নতুন করে সার ডিলার নিয়োগে ২০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। অথচ কৃষক প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ গত সাড়ে ১৫ বছরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, চাঁদাবাজি বন্ধ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধের দাবিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষায়, জনগণকে জুলুম, চাঁদাবাজি ও লুটপাট থেকে মুক্ত করাই তাঁদের আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা ১১ দলের বিজয় চাই না, আমরা এ দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের বিজয় ও মুক্তি চাই।’ জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথের পাশে মানুষের উপস্থিতি এবং সমাবেশে অংশগ্রহণ তার প্রমাণ। পথসভায় আল্লামা মামুনুল হক বলেন, সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আমরাও আঙ্গুল বাঁকা করতে পিছপা হবোনা ইনশাআল্লাহ। সরকার পতনের ডাক আসলেই খুলনাবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহবান জানান তিনি। উল্লেখ্য, সাত দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে লং মার্চ সকালে ঢাকা থেকে শুরু হয়। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধসহ বিভিন্ন দাবিতে এই লং মার্চে অংশ নিয়েছে হাজারেরও বেশি যানবাহন। খুলনার শিববাড়ি মোড়ে ১১ দলের পথসভা শুরু হয় বেলা ১১টায়। সেখানে দুপুর সাড়ে ১২টায় লংমার্চের গাড়িবহর পৌঁছার কথা থাকলেও বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমানে নেতৃত্বাধীন বহরের মাথা পৌঁছে বেলা আড়াইটায়। কিন্তু বহরের শেষাংশ রূপসা সেতু পার হতে লেগে যায় সাড়ে তিনটা।