তাহসিফ সৌরির মৃত্যু: ফের তিন দিনের রিমান্ডে দীপ

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম
তাহসিফ সৌরির মৃত্যু: ফের তিন দিনের রিমান্ডে দীপ
ছবি: সংগ্রহীত

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরির মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে আবারও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। চার দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) তাঁকে আদালতে হাজির করে আরও সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন রিমান্ড আবেদনে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। সেগুলো তদন্তের স্বার্থে গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, উদ্দেশ্য ও জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে তাঁকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ঘটনার আগে তাহসিফকে দীপ ও মামলার আরেক সন্দেহভাজন আসামি জেরিকা তাসনিম দিশার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা এবং রেস্তোরাঁয় খেতে দেখা গেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাঁদের সঙ্গেই দেখা গিয়েছিল তাহসিফকে। এ কারণে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আবেদনে আরও বলা হয়, তাহসিফ ও দীপ ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ একসঙ্গে থাকার সময় দীপ ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য অন্যত্র সরে গিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তা জানতে চায় পুলিশ। এ ছাড়া সংগ্রহ করা বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ দীপকে সঙ্গে নিয়ে যাচাই ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

তদন্তের স্বার্থে দীপসহ তাহসিফ ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের ব্যবহৃত মুঠোফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) সংগ্রহ ও পর্যালোচনা, হত্যাকাণ্ডের স্থান শনাক্ত, আলামত উদ্ধার, হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়গুলোও রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষে আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দীপকে আবার জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তদন্ত কর্মকর্তার কাছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য এসেছে, তবে আসামি সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছেন। সিসিটিভি ফুটেজ ও কথোপকথন বিশ্লেষণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা বা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

দীপের পক্ষে আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ ও মনিরুল ইসলাম রিমান্ড বাতিলের আবেদন করেন। শুনানিতে মুতাসিম বিল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, চার দিনের রিমান্ড শেষ না হতেই আবার সাত দিনের রিমান্ড চাওয়ার যৌক্তিকতা কী। বারবার রিমান্ডে নিয়ে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। দুই পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

যেভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরি। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও জুনিয়র দীপের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে দেখা যায়। তাঁরা হাত মেলানোর পর আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে সেখান থেকে চলে যান।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করেন। হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাছের বস্তি এলাকায় পৌঁছান। সেখান থেকে বাজার বস্তির ভেতর দিয়ে তুরাগ নদসংলগ্ন একটি মাঠের দিকে যাওয়ার সময় কয়েকজন লোককে দেখে তাঁরা আলাদা হয়ে যান বলে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানিয়েছেন।

এর আগে ২৯ অক্টোবর দীপ বলেছিলেন, তাহসিফের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাঁদের আলাদা হয়ে যায়। পরে ৩০ অক্টোবর সকালে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের নম্বরপ্লেটবিহীন কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন দীপ। পরে তাঁকে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেন পিবিআই কর্মকর্তারা।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ৩০ অক্টোবর রাতে রাজধানীর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এজাহারে দীপের ডাকে তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। পরে এ মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ৩১ অক্টোবর ঢাকার আদালত তাঁকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে পাঠান।

এ মামলার আরেক সন্দেহভাজন আসামি জেরিকা তাসনিম দিশাকেও চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গত ১ নভেম্বর আদালত তাঁর রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ঘটনার দিন রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার একটি বারে দিশাকে দেখা গিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে