রাজশাহীর বাগমারায় ভ্যানচালক ওমর ফারুককে (৩৮) চুরির মিথ্যা অপবাদে দুই ঘণ্টাব্যাপী মধ্যযুগীয় বীভৎসতায় হত্যা এবং এই নৃশংসতায় প্রশাসনের রহস্যজনক নজিরবিহীন নির্লিপ্ততার প্রতিবাদে ক্ষোভ ও সংহতি প্রকাশ করেছে রাজশাহীর সুশীল এবং সাংস্কৃতিক সমাজ। আধুনিক সভ্যতায় এক শ্রমজীবী মানুষের হাত-পায়ে লোহার পেরেক গেঁথে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার এই পৈশাচিক ঘটনাকে ‘মনুষ্যত্বের পরাজয়’ হিসেবে অভিহিত করে রোববার (২৮ ডিসেম্বর) রাজশাহীর শীর্ষ চার প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে ‘ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়াস)’ এবং ‘ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়’। আর এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে রাজশাহী থেকে বৃহত্তর গণআন্দোলন শুরু করার হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিন দুপুরে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আকতার-এর সাথে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে একটি জোরালো স্মারকলিপি তুলে দেন নেতৃবৃন্দ। একই সাথে তাঁরা রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি (রাজশাহী রেঞ্জ) এবং রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) বরাবর পৃথক পৃথক স্মারকলিপি পেশ করেন। স্মারকলিপিগুলোতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেন ইয়াস-এর সভাপতি, বিশিষ্ট লেখক ও উন্নয়ন কর্মী মো. শামীউল আলীম শাওন এবং ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়-এর সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মো. রবিন শেখ।
স্মারকলিপিতে গত ১৭ ডিসেম্বর বাগমারার ভবানীগঞ্জ সিএনজি স্ট্যান্ডে সংঘটিত সেই কালিমালিপ্ত ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিনসহ প্রভাবশালী একদল দুর্বৃত্ত ফারুকের দুই হাত ও দুই পায়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ২ ইঞ্চির অন্তত ৮-১০টি লোহার পেরেক গেঁথে দেয়। রড দিয়ে শরীরের প্রতিটি হাড় গুঁড়ো করার পর ফারুক পানি চাইলে তাকে নদীতে চুবিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয়। এমনকি তাঁর পায়ুপথে শুকনা মরিচের গুঁড়া ঢ়ুকিয়ে দেওয়ার মতো আদিম নিষ্ঠুরতা চালানো হয়। এই পৈশাচিক চিত্রটি কেবল একিট হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মানবাধিকার ব্যবস্থার ওপর চরম কুঠারাঘাত।
সাক্ষাৎকালে নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যখন শত শত মানুষের সামনে এই নির্যাতন চলছিল, তখন স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা ছিল রহস্যজনকভাবে নীরব। মুমূর্ষু ও রক্তাক্ত ফারুককে হাসপাতালে নিয়ে জীবন বাঁচানোর বদলে বাগমারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়ার মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৭ দিনের সাজা প্রদান এই হত্যাকাণ্ডকে ত্বরান্বিত করেছে। নেতৃবৃন্দ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘চিকিৎসার বদলে সাজা প্রদান-এটি স্রেফ অবহেলা নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’।’
স্মারকলিপিতে উপস্থাপিত দাবি হচ্ছে- বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে রেজাউল করিম ও আব্দুল মতিনসহ সকল ঘাতককে দ্রুততম সময়ে শস্তিপ্রদান ও কার্যকর করা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা হিসেবে মুমূষর্েুর চিকিৎসা না দিয়ে সাজা প্রদানকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং পাহারায় থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া, নিহতের ১৩ বছরের এতিম সন্তান তামিম ও তাঁর অসহায় বাবা-মায়ের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অবিলম্বে ২০ লক্ষ টাকা সহায়তা প্রদান এবং প্রভাবশালী আসামিদের প্রভাবমুক্ত থেকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
স্মারকলিপি গ্রহণকালে জেলা প্রশাসক (ডিসি) আফিয়া আকতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন উল্লেখ করে ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোস্যাল চেঞ্জ-ইয়্যাস’র সভাপতি (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত) মো. শামীউল আলীম শাওন ও মো. রবিন শেখ রোববার সন্ধ্যায় প্রতিবেদককে বলেন, ‘ফারুকের পরিবারের কান্নার প্রতিধ্বনি আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনে বাজছে। আমরা এই ঘটনার শেষ না দেখে রাজপথ ছাড়ব না। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে রাজশাহী থেকে বৃহত্তর গণআন্দোলন শুরু হবে।’