মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের মাসে বীর প্রতীক অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট সার্জেন্ট রত্তন আলী শরীফ (৮২) রবিবার দিবাগত রাতে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহির......রাজিউন)।
তার মৃত্যুর খবর শুনে ২৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে "ইউএনও বাবুগঞ্জ" নামের ফেসবুক আইডি থেকে একটি আবেগঘণ স্ট্যাটাস দিয়েছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মানবিক নির্বাহী অফিসার আসমা উল হুসনা।
পাশাপাশি ফেসবুক স্ট্যাটাসের পাশাপাশি দুইটি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। যে ছবি দুইটি ঠিক ১২দিন আগে ইউএনও তার নিজ হাতে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারন করেছিলেন।
পাঠকদের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবুহুব তুলে ধরা হলো-১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীর প্রতীক রতন শরীফ মহোদয়ের সাথে প্রথম দেখা। অত্যন্ত বিনয়ী এবং সদালাপী মানুষ। অনেক গল্প হলো, কিছু ছবি তোলা হলো, কিন্তু আমার উনার কাছ থেকে গল্প শোনার বা উনার কথা বলার ঝুড়ি যেনো ফুরাচ্ছিলো না।
বলেছিলেন আমার অফিসে আবার আসবেন খুব দ্রুতই, তখন অনেক যুদ্ধের সময়ের গল্প শোনাবেন। সেদিন একটু অসুস্থ থাকায় মাইকে বেশি কথা বলেননি। কথা নিয়েছিলাম আসছে ২৬ মার্চ এতো সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দিলে হবেনা।
'এতো কথা দেয়া ও নেয়াকে' পেছনে ফেলে তিনি আজ সন্ধ্যা ৬ টা ৩০ মিনিটে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে পরকালের পথে পা বাড়ালেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বীর প্রতীক রতন শরীফের বর্ণাঢ্য জীবনবৃত্তান্ত : বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি ইউনিয়নের রাকুদিয়া গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীর প্রতীক ও দেহেরগতি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান রত্তন আলী শরীফ (বীর প্রতীক রতন শরীফ) ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ১৯৬৩ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৭২ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আগে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেন।
বীরপ্রতীক রতন শরীফ ছিলেন একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বিমান বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তিনি একাধিক দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেন।
তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করে, যা দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা। মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি তিনি স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দেহেরগতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এলাকায় উন্নয়ন ও জনসেবামূলক কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বীরপ্রতীক রতন শরীফ ছিলেন স্বাধীনতার এক জীবন্ত ইতিহাস। তার বীরত্ব ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও সাহসী করে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। আগামী প্রজন্মের মধ্যে তিনি একজন প্রকৃত বীর হিসেবে বেঁচে থাকবেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মরহুম বীর প্রতীক রতন শরীফ মহোদয়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন ধরে ডায়াবেটিক ও প্রেসার নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) বিকেলে বীর প্রতীক ও অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট সার্জেন্ট রত্তন আলী শরীফকে শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো।
হাসপাতালের পঞ্চম তলার ৫০০৩ নাম্বার কেবিনে ভর্তি রত্তন আলী শরীফ রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃতের সন্তানরা অভিযোগ করেন-চিকিৎসা অবহেলায় তার বাবা বীর প্রতীক রত্তন আলী শরীফ মৃত্যুবরণ করেছেন। এ অভিযোগের ভিত্তিত্বে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠণ করেছে।