কালের বিবর্তনে আধুনিক সেচযন্ত্রের ভিড়ে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে গ্রাম বাংলার কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী আদি সেচযন্ত্র “দোন”/ জাঁত বা কুন। শত শত বছর ধরে মানুষ কৃষি কাজে পানি সেচের জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিলো এই দোন /জাঁত বা কুন পদ্ধতি। যার সাহায্যে ফসলের ক্ষেতে বিশেষ করে সরিষা ও ধান চাষে অতি সহজে সেচ দেয়া যেতো।
সারাদেশে প্রায় বিলুপ্ত হলেও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর ইউনিয়নের চানগোসাইপুর ও নামাগোসাইপুর প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরীব কৃষক আব্দুল কুদ্দুস (৫৫) তার জমিতে দোন আঞ্চলিক ভাষায় যাকে কুন বলে, তা দিয়ে সরিষা জমিতে পানি দিচ্ছেন তার দেড় বিঘা ক্ষেতে এবং মাইজচর ইউনিয়নের আয়নারগোপ গ্রামের প্রবীন কৃষক পছন্দ আলী (৭৪) তার ১ বিঘা জমিতে এবং দিঘীরপাড় ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের বরকত ভূঁইয়া (৬২) পৌনে এক বিঘা জমিতে সেচ দিচ্ছেন "দোন" দিয়ে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, এভাবে পানি সেচ দিলে খরচ অনেক কম হয়। ক্রস আকারে দুটি বাঁশের শক্তপুক্ত খুঁটি মাটিতে পুঁতে তার সঙ্গে লম্বা অন্য একটি বাঁশ বেঁধে দেওয়া হয়। এক প্রান্তে দোনের মাথা অন্য প্রান্তে মাটির ভরা (ওজন) দিয়ে পানিতে চুবিয়ে তুললে পানি উঠে আসে। এভাবে অনবরত পানি সেচ দিলে দ্রুত সেচের কাজ হয়ে যায়। আম, গাব অথবা কাঁঠালজাতীয় গাছের মাঝের অংশের কাঠ কেটে নিয়ে তার মাঝ খানে খোদাই করে ড্রেন তৈরী করে পানি সেচ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো। কোন কোন স্থানে নারিকেল, তাল, সুপারি গাছ দিয়েও এ দোন তৈরী করা হতো। আবার কেউ কাঠের তক্তা দিয়েও এই দোন তৈরী করতো বলে কৃষকরা জানান।
হাওরের নদীর পাড়ের গরীব কৃষকরা সরিষা ও ধানের জমিতে কুন দিয়ে পানি দিচ্ছেন তাদের নিজস্ব জমিতে।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা গ্রাম বাংলার আদি ঐতিহ্যের প্রতীক দোন দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছেন। তারা সকলেই অত্রাঞ্চলের গরীব কৃষক। হাওরাঞ্চলে শত শত গরীব কৃষক রয়েছে। অর্থের অভাবে তারা ডিজেল দিয়ে তাদের জমিতে পানি দিতে পারছেন না। সেজন্যে প্রতিবছরই তারা নিজেরা এভাবে কায়িকশ্রমে জমিতে পানি সেচ দিয়ে আসছেন বলে জানান।
দোন দিয়ে পানি সেচ দেয়া অবস্থায় কৃষক পছন্ধ আলী জানান, ৩০-৪০ বছর আগেও এ এলাকার সকল কৃষক বোরো ধান খেতে দোন দিয়ে পানি সেচ দিতো। সবাই বন্ধ করে দিলেও তিনি ঐতিহ্য হিসেবে আজও তার ১বিঘা জমিতে দোনের সাহায্যে পানি সেচ দিয়ে যাচ্ছেন। এতে একটু পরিশ্রম হলেও সেচ খরচ নেই। ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ অনেক কম হয় বলেও তিনি জানান ।
স্থানীয় বয়স্করা জানান, শ্যালো, ডিপসহ বিভিন্ন ধরণের আধুনিক সেচযন্ত্র আসায় সেই প্রাচীন যুগের কৃষকদের তৈরি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী দোন প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আগেকার দিনে ফসলি জমিতে পানি সেচের জন্য টিন ও বাঁশের অথবা টিন ও কাঠের তৈরী দোন ব্যবহার হতো। নদী, খালবিল বা জলাশয় থেকে কৃষকরা ফসলি জমিতে পানি সেচের জন্য এই দোন ব্যবহার করতো। উঁচু- নিচু জমিতে পানি সেচ দিতে দোন ছিলো অতুলনীয়। গ্রাম বাংলার কৃষকদের আবিষ্কার ছিলো এই দোন।
হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকরা এখনও 'কুন' (বাঁশের তৈরি সেচযন্ত্র) বা 'দোন'-এর মতো আদিম পদ্ধতি ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিচ্ছেন। কারণ ডিজেল বা আধুনিক পাম্পের উচ্চমূল্য এবং পানির সংকট তাদের নাগালের বাইরে, ফলে তারা কায়িক শ্রম দিয়ে বা পুরাতন যন্ত্রে ভরসা রাখছেন, যা সেচ খরচ কমালেও শ্রমসাধ্য।
বাজিতপুর উপজেলা ব্লক সুপারভাইজার বলেন, আধুনিক কৃষিতে দোন দিয়ে পানিসেচ হাওরের কোনো কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে এখনো দেয়, তবে এর সংখ্যা খুবই নগন্য।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, এক সময়ে সারাদেশে খাল-বিল, নদী-নালাসহ প্রাকৃতিক জলাধার থেকে কৃষকেরা দোন দিয়ে জমিতে পানি সেচ দিতো। এতে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার হওয়ায় পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাব পড়ত না। ফসলের উৎপাদন খরচও হতো অনেক কম।