প্রকৃতিতে চলছে শীতের আমেজ। কুয়াশার চাঁদর, শিশিরে সিক্ত ঘাস, পত্রপল্লব। এই শীতে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবে শীতকালীন পিঠা জড়িয়ে আছে বাঙালির অস্তিত্বে। শীতকালের বিকেলে কিংবা সকালের মিষ্টি রোদ পোহাতে পোহাতে নাশতা করার সময় শীতের পিঠার জুড়ি নেই। শুধু তাই নয় পিঠা বাংলার আদিম এবং আভিজাত্যপূর্ণ খাবার। বাঙালির লোক ঐতিহ্যে বিভিন্ন পিঠার ইতিহাস এক কালজয়ী সাক্ষী। আর তাই অন্য কোনো ঋতুর চেয়ে শীত ঋতুতেই মুখরোচক নানা স্বাদের পিঠার উৎসব করে থাকে ভোজনরসিকরা। এই ঐতিহ্যকে লালন করে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে দিনব্যাপী শীতকালীন পিঠা উৎসব করেছে আল কাওছার মেরিট মাদরাসা। কলেজ মোড়স্থ মাদরাসা প্রাঙ্গনে ১০টি স্টলে বাহারী সজ্জায় সাজানো এই উৎসবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন। স্মৃতি রেখে দিতে তোলেন ছবি, করেন আনন্দ উৎসব। আনন্দ উৎসবে মুখরিত হয় মাদরাসা ক্যাম্পাস। বাঙালির খাবারের ইতিহাস ঘাঁটলে পিঠার অস্তিত্ব পাওয়া যায় অন্তত পাঁচশো বছর আগে থেকে। পুরোনো অনেক গল্প, লোকগাঁথায় উঠে এসেছে নানা পিঠার নাম। আর এ থেকেই বোঝা যায়, পিঠা আমাদের ঐতিহ্য। স্বাদের যে কত রকম ভিন্নতা হতে পারে, তা সেসব পিঠা না খেলে বোঝা সম্ভব নয়। কোনোটি হয়তো ডুবো তেলে ভাজা, কোনোটি আবার ভাপে তৈরি। কোনোটি শুকনো খোলায়, কোনোটি আবার দুধে ভেজানো। চিতই, ভাপা, পুলি, ছিটা পিঠা, পাটিসাপটা, সুজির বরফি, ডালের বরফি, ঝিনুক পিঠা, লাভ পিঠা, মাছ পিঠা, কামরাঙ্গা, পাকন, লবঙ্গ লতিকা, বিবিখানা পিঠা, পোয়া পিঠা, মুঠি পিঠা, নকশি পিঠা, গোকুল পিঠা, সেমাই পিঠা ইত্যাদি প্রায় সব এলাকায়ই পরিচিত। কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন ঘরোয়াভাবে পিঠা পুলির আয়োজন অনেকটাই অসম্ভব। ফলে হাট-বাজার বা গ্রামগঞ্জের মোড়ে পিঠার স্বাদ নিতে যান অনেকে। কিন্তু তাতে যেমন মেলে না পিঠা খাওয়ার আনন্দ, তেমনই মেলেনা পরিবার বা স্বজনদের নিয়ে একসাথে খাওয়ার সুযোগ। তাই এমন পিঠা উৎসবের আয়োজনে মুগ্ধ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা। মেলায় ঘুরতে আসা চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহজাবিন, ৫ম শ্রেণির আল-আমিন, রাইয়ান জানায় তারা এর আগে কখনও পিঠা মেলা দেখেনি। এই মেলায় এসে নাম না জানা অনেক স্বাদের পিঠা খেয়ে আর পিঠাগুলোর সাথে পরিচয় হতে পেরে আনন্দিত তারা। মাদরাসার শিক্ষক মাসুদা খাতুন রুম্পা জানান তিনি এই উৎসবকে ঘিরে বিভিন্ন স্বাদের ১০ প্রকারের পিঠা বানিয়েছেন। সেই পিঠাগুলো স্টলে বিক্রি করেছেন। তার সব পিঠা বিক্রি হয়েছে। এর আগে তিনি এভাবে কখনও মেলায় পিঠা বিক্রি করেননি। তবে এখানে পিঠা বিক্রির পাশাপাশি বেশ আনন্দ পয়েছেন তিনি। মাদরাসার শিক্ষক হাফেজ মো. মহিবুর রহমান, অভিভাবক জাহাঙ্গীর বাদশা টুটুল জানান, এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের মননশীলতার বিকাশের পাশাপাশি তারা সুস্থ বিনোদন পেয়েছে। তারা চান এই আয়োজন শুধু আল কাওছার মেরিট মাদরাসা নয় সব প্রতিষ্ঠানে হোক। আল কাওছার মেরিট মাদরাসার পরিচালক মাওলানা মো. জোনায়েদ হোসেন বলেন বাঙালির ঐতিহ্য রক্ষা আর সুস্থ বিনোদনের পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্ম যাতে করে হরেক রকম পিঠা চিনতে পারে এবং কোন পিঠার কেমন স্বাদ সেটা সম্পর্কে ধারণা রাখতে পারে সে লক্ষেই এ আয়োজন। পাশাপাশি এই সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা আর সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে যাতে শিক্ষার্থীরা বাঙালির পুরনো ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করতে পারে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হয়।