জামালপুর-৩ আসনের ৯ এমপি প্রার্থীর সম্পদের বিবরণ

এফএনএস (শাহ জামাল; মেলান্দহ, জামালপুর) : | প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:২৮ পিএম
জামালপুর-৩ আসনের ৯ এমপি প্রার্থীর সম্পদের বিবরণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনের ৯ এমপি প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি’ মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের স্ত্রীর সম্পদ বেশি। নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত প্রার্থীর হলফ নামায় এই তথ্য পাওয়া গেছে। মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসএস। তাঁর পিতা আব্দুল হাই জামালী ছিলেন একজন সৎ ইউপি চেয়ারম্যান-সমাজসেবক এবং শিক্ষানুরাগি। তিনি কেন্দ্রীয় বিএনপি’র জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক এবং মেলান্দহ উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি। ইতোপূর্বে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। এরশাদ পতন আন্দোলনে বাবুলের নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। বিবিসি-ভয়েস অব আমেরিকাসহ দেশীয় গণমাধ্যমে কভার প্রচ্ছদ হয়ে আলোচনায় আসেন। তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মেলান্দহবাসি তাঁকে গণসংবর্ধনা প্রদান করেছিল।  বিএনপিতে যোগদানের পর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ২০০১ সালে তিনি দেয়াল ঘড়ি মার্কায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধিতা করে অল্প ভোটের ব্যবধানে আ’লীগ প্রার্থী মির্জা আজমের কাছে হেরে যান। সর্বশেষ তিনি ২০১৮ সালে বিএনপি’র মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষে প্রতিদ্বন্ধিতা করেন। ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে বেলা ১১টার দিকে সাংবাদিক সম্মেল করে নির্বাচন বর্জন করেন। চলতি নির্বাচনকে চূড়ান্ত ভাগ্য পরিক্ষা মনে করছেন বাবুল ভক্তরা। বাবুল পেশায় ব্যবসায়ী। বাবুলের নিজ নামে সম্পদ দেখিয়েছেন-১৪ হাজার ৫শ’ ৬২ দশমিক ৬৪ মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮শ’ ৪৫ দশমিক ৮৬ টাকা। নিজের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, ডিপোজিট, ডিপিএস, ডাকসঞ্চয় ৯৫.৩৬ শতাংশ কৃষিসহ অন্যান্য সঞ্চয়ের পরিমান ২ কোটি ৪৪ লাখ ১১ হাজার ৬শ’ ৩৯ টাকা। এ ছাড়াও বাবুলের নিজের নামে ৩০ ভরি এবং স্ত্রীর নামে ৮০ ভরিসহ মোট ১৩০ ভরি স্বর্ণের মুল্য অজানা। সম্পদের বিবরণীতে দেখা যায়, বাবুলের চেয়ে ব্যবসায়ী স্ত্রী শিউলির নামে বেশি সম্পদ এবং ঢাকায় দুটি ফ্লাট বাড়ি। স্ত্রীর নামে নগদ, এফডিআর, ব্যবসার খাতসহ অন্যান্য খাতে সর্বমোট ৪ কোটি ২৫ লাখ ৪৮হাজার ৪১ টাকা। যা বাবুলের সম্পদের চেয়ে প্রায় দুই গুন। মেয়ের নামেও সাড়ে ১৩ লাখ টাকার আরেকটি ফ্লাট বাড়ি আছে। 

বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী সাদিকুর রহমান শুভ সিদ্দিকী: বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী সাদিকুর রহমান সিদ্দিকী (স্বতন্ত্র) কাপপিরিচি মার্কায় প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তিনি মেলান্দহ উপজেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত রাজনীতিক আবদুর রহমান সিদ্দিকীর নাতিন শুভ সিদ্দিকী। আবদুর রহমান সিদ্দিকী ছিলেন, ভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক। পাকিস্তানের শাসন-শোষনের প্রতিবাদে তিনিই প্রথম বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ করেন। আবদুর রহমান সিদ্দিকী সম্পাদিক সংগ্রামী বাংলা নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের দলিল, যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে আবদুর রহমান সিদ্দিকী প্রায় ১ যুগ কারাবরণ করেন। পরে তিনি আ’লীগ থেকে বেরিয়ে আ’লীগ মিজান গ্রুপের মই মার্কায় নির্বাচনে হেরে যান। শুভ সিদ্দিকীর শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক পাশ। পেশায় ব্যবসায়ী। হলফ নামায় তাঁর সম্পদ বিবরণীতে তাঁর নগদ অর্থ আছে ২ লাখ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা ৪৪ লাখ ৯ হাজার ৬৬ টাকা। স্ত্রী গৃহিনী শাহানা আক্তারের নামে ২০ ভরি স্বর্ণ সমমুল্য ২০ লাখ টাকা। এ ছাড়াও শুভর নিজ নামে আছে গাড়ি, কৃষি-অকৃষি জমি, আসবাবপত্র, ১টি ফ্লাটবাড়িসহ সর্বমোট ১ কোটি ৫২ লাখ ৫৬ হাজার ৪শ’ ৫৬ টাকার সম্পদ। এ ছাড়াও স্ত্রীর নামে রয়েছে ২০ ভরি স্বর্ণ।

জামাত প্রার্থী মুজিবুর রহমান আজাদী: জামাত মনোনীত প্রার্থী আলহাজ মাও. মুজিবুর রহমান আজাদী। শিক্ষাগত যোগ্যতা কামিল (এমএ) পাশ। পেশা শিক্ষকতা। জামাত নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাঁর সততার বিষয়টি বেশ আলোচিত। জামাত মনোনীত প্রার্থী আলহাজ মাও. মুজিবুর রহমান আজাদীর সম্পদ বিবরণীদে নিজের নামে সোনালী ও ইসলামি ব্যাংকে জমা মাত্র ২ হাজার টাকা। আসবাবপত্র ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য প্রায় ২ লাখ টাকা, ৬০ শতাংশ জমি সমমুল্য ৬ লাখ টাকা একটি ভবন ৪০ লাখ টাকাসহ সর্বমোট ৫০ লাখ ৮৪ হাজার ২শ’ ৬৭  টাকা দেখানো হয়েছে। গ্রহিনী স্ত্রী শিউলি আক্তারের নামে ২০ ভরি স্বর্ণ যার বাজার মুল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, ৬২ শতাংশ জমির মুল্য ১৮ লাখ ৬০ হাজার টাকাসহ প্রায় ২০ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। 

ইসলামী আন্দোলনের ইঞ্জিনিয়ার দৌলতুজ্জামান আনছারী: ইসলামি আন্দোলন মনোনীত (হাতপাখা) ইঞ্জিনিয়ার আলহাজ দৌলতুজ্জামান আনছারী। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার টেক্সটাইল। ইতোপূর্বে তিনি সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন। তিনি এলাকায় একজন দানবীর, সত, শিক্ষানুরাগি এবং ধার্মিক লোক হিসেবে পরিচিত।সম্পাদক বিবরণীতে তাঁর আছে নগদ অর্থ ১ কোটি ৬৯ লাখ ২০ হাজার ১শ’ ৫৫ টাকা। বাড়ি ভাড়া থেকে আয় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬শ’ ৫৩ টাকা, ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৩২ হজাার ৪শ’ ৫০ টাকা। ঢাকায় ফ্লাটবাড়ি এবং জামালপুরে যৌথ মালিকানায় দুটি বাড়ি, নিজের নামে ব্যাংকে জমা ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৫শ’ ৩ টাকা, শেয়ার, ডিপোজিট, এফডিআর, ডাকসঞ্চয়পত্র ১০ লাখ টাকা, কৃষিখাতে ১ লাখ ৯১ হাজার ৫শ’ টাকা, যানবাহন, ইলেক্ট্রনিক পণ্য, আসবাবপত্রসহ অন্যান্য বাবদ সর্বমোট ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৭ হাজার ৩শ’ ১২ টাকা। যার সিংহভাগ বৈধ আয়ের উৎস বাড়ির মুল্য থেকে দেখানো হয়েছে। অপরদিকে স্ত্রী অবসপ্রাপ্ত শিক্ষক তাসনীম আরা বেগমের নামে নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা এফডিআর, ডিপোজিট, ডাকসঞ্চয়, গহনা, ইলেক্ট্রিক্যাল পণ্যসহ অন্যান্য খাতে সর্বমোট ১ কোটি ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫শ’ ৬ টাকা। এরমধ্যে তাঁর ২০ লাখ টাকার ঋৃণও আছে। 

জাতীয় পার্টির মীর শামসুল আলম লিপটন: জাতীয় পার্টি মনোনীত আলহাজ মীর শামসুল অলাম লিপটনের প্রতিক লাঙ্গল। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসএস। তিনিও কয়েকবার সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন। তিনি একজন সমাজসেবক, দানবীর, তরুণ এবং উদীয়মান রাজনীতিক।  সম্পদ বিবরণীতে তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন  ১৭ লাখ টাকা ৩ হাজার ৩শ ৩৯ টাকা। পাশাপাশি বেসরকারি চাকরি থেকে বেতন পান  ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়াও তাঁর নিজ নামে প্রায় ৬০ লাখ টাকার ব্যবসার মূলধন, শেয়ার,কৃষি, পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ, যানবাহন, আসবাবপত্র, ইলেক্ট্রনিক পণ্যসহ অন্যান্য খাতে সর্বমোট- ৮২ লাখ ৭৫ হাজার ৩শ’ ১২ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন।  এ ছাড়াও স্ত্রীর নামে ২৫ ভরি স্বর্ণ আছে। 

গণঅধিকার পরিষদ মনোীত লিটন মিয়া: গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত (ট্রাক মার্কা) তরুণ-উদীয়মান রাজনীতিক লিটন মিয়ার সম্পদ বিবরণীতে নিজের বেসরকারি চাকরি থেকে তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ৪ লাখ ১২ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। শেয়ার, সঞ্চয়, ব্যাংক আমানত আছে ৩৫ হাজার, নগদ অর্থ ৩ লাখ ২৫ হাজার, ব্যাংকে জমা ৩৫ হাজার, ফিক্সড ডিপোজিট ১ লাখ ২০ হাজার, আসবাবপত্র, ১৫ ভরি স্বর্ণসহ সর্বমোট ২২ লাখ ২৭ হাজার টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। 

ফিদেল নঈম: গণসংহতি আন্দোলন (মাথাল মার্কা) মনোনীত তরুণ-উদীয়মান রাজনীতিক ফিদেল নঈম পেশায় চাকরিজীবি। শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিবিএস। তিনি কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহবায়ক নঈম জাহাঙ্গীরের ছেলে। নঈম জাহাঙ্গীর এক সময় সিপিবির সভাপতি ছিলেন। পরে বিএনপি’র রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বর্তমানে তিনি রাজনীতি থেকে অবসরে আছেন। নঈম জাহঙ্গীরের ছেলে ডা. ফিদেল নঈমের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়েছেন। এ ছাড়াও বাসাবাড়ির ব্যবহারিক নিত্যপণ্য, মোবাইল ফোন ইত্যাদি খাতের ১ লাখ ২০ হাজার টাকার সম্পদ দখিয়েছেন। স্ত্রীর নামে কোন সম্পদ নাই।

স্বতন্ত্র প্রার্থী শিবলুল বারী রাজু চেয়ারম্যান: মাদারগঞ্জ উপজেলার একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী শিবলুল বারী রাজু (সূর্যমুখী ফুল) পেশায় কৃষক। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ পাশ। তিনি গণমুক্তি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমানেও তিনি ইউপি চেয়ারম্যান। সততা-ত্যাগ-নিষ্ঠাবান হিসেবে এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। কৃষি খাতকে তিনি আয়ের উৎস দেখিয়েছেন। তাঁর নগদ অর্থ ১৩ লাখ টাকা দেখিয়েছেন। ব্যাংকে জমা, এফডিআর, যানবাহন, আসবাবপত্র, স্ত্রীর নামে ২ ভরি স্বর্ণসহ সর্বমোট প্রায় ৩১ লাখ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন।

ফারজানা ফরিদ পুথি: স্বতন্ত্র এবং একমাত্র মহিলা প্রার্থী ফারজানা ফরিদ পুথি ফুটবল মার্কায় প্রতিদ্ধন্ধিতা করছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিএ পাশ। পেশায় ব্যবসা। তাঁর পিতা একজন ইউপি সদস্য ছিলেন। পুথি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। তাঁর নগদ অর্থ আছে ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ব্যবসার মুলধন আছে ১ কোটি ২৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯শ’ ৩১ টাকা। আছে ৪০ ভরি স্বর্ণ, যার মুল্য অজানা। এ ছাড়াও কৃষি-অকৃষি জমি, আসবাবপত্রসহ আনুসাঙ্গিক সমুদয় সম্পদের পরিমান ১ কোটি ৬৪ লাখ ৬৫ হাজার ৯শ’ ৩১ টাকা। তাঁর স্বামীর নামে আছে ১৮ লাখ ৮০ হাজার ৪শ’ টাকার সম্পদ।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে