ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ

ইঁদুরে বৈদ্যুতিক তার কাটায় যমুনা সার কারখানায় ব্ল্যাকআউট

এফএনএস (এস এম এ হালিম দুলাল; জামালপুর) : | প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:১১ পিএম
ইঁদুরে বৈদ্যুতিক তার কাটায় যমুনা সার কারখানায় ব্ল্যাকআউট

জামালপুরের সরিষাবাড়ী তারাকান্দিতে অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা ইউরিয়া সার কারখানায়  আবারো সার উৎপাদন বন্ধ। এই গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইঁদুরের কামড়ে বৈদ্যুতিক তার কেটে দেওয়ার ঘটনায় কারখানাটি অচল হয়ে পড়েছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু অদ্ভুত নয়, বরং শিল্প নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে  প্রশ্ন তুলেছে এলাকাবাসী।  জানা যায় বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) গভীর রাতে কারখানার পাওয়ার প্লান্টে শর্ট সার্কিট হয়ে হঠাৎ ব্ল্যাকআউট দেখা দিলে ইউরিয়া সার উৎপাদন আবারো বন্ধ হয়ে যায়।  কারখানা সূত্রে জানাগেছে, রাত ১টার দিকে পাওয়ার প্লান্টের বৈদ্যুতিক লাইনে ইঁদুর ঢ়ুকে তার কেটে দিলে শর্ট সার্কিট হয়। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া থেমে যায়। এ বিষয়ে জিএম অপারেশন মোঃ ফজলুল হক বলেন, “মধ্যরাতে পাওয়ার প্লান্টে ইঁদুর ঢ়ুকে তার কেটে দিলে শর্ট সার্কিট হয়ে পুরো কারখানায় ব্ল্যাকআউট হয়। দ্রুত মেরামত কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে শনিবার নাগাদ আবার উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি। স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ২৩ মাস কারখানায় তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকার পর  গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ গ্যাস সংযোগ পেয়ে উৎপাদন শুরু হলেও কখনো গ্যাসচাপ কমে যাওয়ায়, কখনো প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এবার নতুন করে যুক্ত হলো ইঁদুরের কামড়ের উপদ্রব। গণঅধিকার পরিষদ সরিষাবাড়ী উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আল-আমিন মিলু বলেন, “হাজার হাজার কোটি টাকার কারখানা একটা ইঁদুরের কামড়ে বন্ধ হয়ে গেলে সেটা শুধু দুর্ভাগ্য নয় বরং, এটা অব্যবস্থাপনার লক্ষণ। তিনি আরও বলেন, বড় শিল্প স্থাপনায় রডেন্ট (ইঁদুর) নিয়ন্ত্রণ একটি নিয়মিত প্রটোকলের অংশ। পাওয়ার প্লান্ট, কেবল ট্রে ও কন্ট্রোল রুমের মতো স্পর্শকাতর স্থানে তার ও যন্ত্রপাতি সুরক্ষায় বিশেষ কভার, সিলিং এবং নিয়মিত পরিদর্শন বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে কারখানার বিদ্যুৎকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করা এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইঁদুরের কারণে তার কেটে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আছে। কিন্তু বড় শিল্প কারখানায় সাধারণত কেবলগুলো সুরক্ষিত ট্রেতে থাকে, প্রবেশপথগুলো সিল করা থাকে। নিয়মিত পেস্ট কন্ট্রোল করা হয়। এসব ব্যবস্থা ঠিকমতো থাকলে পুরো প্লান্ট ব্ল্যাকআউট হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।” তিনি বলেন, “একটি ইঁদুর ঢ়ুকে তার কাটল আর পুরো প্লান্ট বন্ধ হয়ে গেল-এটা বোঝায় যে কোনো না কোনো স্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় ঘাটতি ছিল। চলতি ইরি বোরো মৌসুমে যমুনা ইউরিয়া সার কারখানার থেকে জামালপুর শেরপুর বৃহত্তম ময়মনসিংহ জেলা সহ উত্তরবঙ্গের ১৯ টি জেলায় সার সরবরাহা হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় বারংবার গ্যাস সংকট সহ বিভিন্ন অজুহাতে কারখানার সার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়া। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে সার সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই, তবে ঘন ঘন উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার কারণে শিল্প ব্যবস্থাপনায় আস্থার সংকট তৈরি করছে। যমুনা সার কারখানার নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কর্মরত কর্মকর্তা বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে চাপ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ, যন্ত্রপাতি আধুনিকীকরণ ও প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি থাকলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগের একজন সাবেক প্রকৌশলী বলেন, “পাওয়ার প্লান্টের মতো জায়গায় কেবল সুরক্ষা ও রডেন্ট কন্ট্রোল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিয়মিত না করলে ছোট একটি ত্রুটি বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।” কারখানার জিএম অপারেশন মো. ফজলুল হক বলেন, “ঘটনাটি দুঃখজনক। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। কোথায় ঘাটতি ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ইঁদুরের কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা। বড় শিল্প স্থাপনায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শুধু বড় দুর্ঘটনা ঠেকানোর জন্য নয়; ছোট ত্রুটির চেইন প্রতিক্রিয়া ঠেকাতেও কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। সর্বোপরি একটি ইঁদুরের কামড়ে যদি পুরো কারখানা অচল হয়ে যায়, তাহলে প্রযুক্তিগত ত্রুটির ঝুঁকি বা নাশকতার পরিস্থিতিতে কি ধরনের প্রস্তুতি কর্তৃপক্ষের রয়েছে সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল