বরিশাল-১ (গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া) আসনে এবারের নির্বাচন কোনো একক রাজনৈতিক ধারার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। বাহির থেকে পরিস্থিতি শান্ত মনে হলেও ভেতরে চলছে ভোটের জটিল অঙ্ক। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ভোটার যুক্ত হওয়ায় আগের নির্বাচনের প্রচলিত সমীকরণ ভেঙে পরার ইঙ্গিত মিলছে। দলীয় বিভাজন, নীরব ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতিতে এখানে তৈরি হয়েছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের বড় একটি অংশ দলীয় রাজনীতির বাহিরে অবস্থান করায় তাদের আচরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে তারা উন্নয়ন, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, ক্লিন ইমেজের প্রার্থী এবং প্রার্থীর মাঠপর্যায়ের উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। প্রকাশ্যে অবস্থান না নেয়া এই ভোটাররা শেষ মুহুর্তে যে প্রার্থীর দিকে ঝুঁকবেন, সেই প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত হবে। ফলে নতুন ভোটারদের অবস্থান এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে এবং ফলাফলে মূল ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। অপরদিকে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরাসরি মাঠে না থাকলেও দলটির ভোট যে গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, এমনটি মনে করছেন না স্থানীয় রাজনীতিবিদরা। বরং এই ভোটের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও শেষ মুহুর্তে সমন্বিতভাবে কোনো একটি দিকে ঝুঁকে পরতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসিব নিরব সংগঠিত ভোটে ফলাফলে প্রভাব ফেলতে সক্ষম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক সংসদ সদস্য এম জহির উদ্দিন স্বপন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দলীয় সাংগঠনিক ভোটব্যাংক তার বড় শক্তি হলেও একই ভোটব্যাংকের ভেতরের বিভাজন তার জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভোট বিভাজনের কেন্দ্রেই রয়েছেন ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবহান। বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য থাকা অবস্থায় দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নেমেছেন এবং পরবর্তীতে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তবে বহিষ্কারের পরেও তার মাঠপর্যায়ের তৎপরতায় ভাটা পরেনি। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত আগৈলঝাড়া উপজেলায় তার বাড়ি হওয়ায় ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক যোগাযোগ ও স্থানীয় প্রভাব তাকে ওই এলাকায় শক্ত অবস্থানে রেখেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোটও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে সামনে এসেছে। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থী হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম খান শুরু থেকেই সংগঠিত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী ও দলীয় ভোটব্যাংক তার শক্ত জায়গা। বিএনপির ভোট বিভাজন এবং নতুন ও নীরব ভোটের একটি অংশ তার দিকে গেলে তিনি হঠাৎ করেই লড়াইয়ের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. রাসেল সরদার মেহেদী এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) মনোনীত সাইকেল প্রতীকের প্রার্থী ছেরনিয়াবাত সেকান্দার আলী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন। বরিশাল-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২৮ হাজার ১৯৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৬৪ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৪ জন। সবমিলিয়ে দলীয় রাজনীতি, স্বতন্ত্র প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং নতুন ও নিরব ভোটের সমীকরণে বরিশাল-১ আসনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চিত ও টানটান এক নির্বাচনী পরিস্থিতি। প্রকাশ্যে অবস্থান না নেয়ায় ভোটারদের সিদ্ধান্ত শেষমুহুর্তে এই আসনের চিত্র আমূল বদলে দিতে পারে। শেষপর্যন্ত ভোটাররা কোন সিদ্ধান্ত নেন, তারই প্রতিফলন মিলবে ভোটের দিন ব্যালট বাক্সে।