দীর্ঘ ২০ বছর পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে এখন পর্যন্ত বেসরকারি ফলাফলে ১৭৫টি আসনে জয় পেয়েছে দলটির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থীরা। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ৫৬টি আসনে জয়লাভ করেছেন। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি ৬টি এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা ১১টি আসনে জয় পেয়েছেন। বাকি ৪২টি আসনের ফলাফল এখনো প্রক্রিয়াধীন।
শীর্ষ নেতাদের জয় ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে, ঢাকা-১৫ আসনে বিজয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বেসরকারিভাবে জয়ী হয়েছেন যারা:
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ আসনে জয়ী হয়েছেন। দলটির বিজয়ী অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন-মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ঠাকুরগাঁও-১), সালাহউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১), আসাদুজ্জামান (ঝিনাইদহ-১), ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ (ভোলা-১), কাজী রফিকুল ইসলাম (বগুড়া-১), মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (কুমিল্লা-৩), নুরুল ইসলাম নয়ন (ভোলা-৪), জি কে গওস (হবিগঞ্জ-৩), আহমেদ আজম খান (টাঙ্গাইল-৮), আজহারুল ইসলাম মান্নান (নারায়নগঞ্জ-৩), মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু (শরীয়তপুর-৩), মুরশেদ মিল্টন (বগুড়া-৭), আব্দুল বারী (জয়পুরহাট-২), আরিফুল হক চৌধুরী (সিলেট-৪), লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু (ময়মনসিংহ-৮), নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা (সিলেট-২), আবু মুনসুর সাখাওয়াত হাসান (হবিগঞ্জ-২), এম এ হান্নান (ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া-১), ইলিয়াস মোল্লা (ফরিদপুর-১), শামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২), নায়াব ইউসুফ আহমেদ (ফরিদপুর-৩), শহীদুল ইসলাম বাবুল (ফরিদপুর-৪), আনোয়ারুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম-১), সরওয়ার জামাল নিজাম (চট্টগ্রাম-১৩), খন্দকার মোশারফ হোসেন (কুমিল্লা-১), ইশরামুল বারী টিপু (নওগা-৪), মঈনুল ইসলাম খান (মানিকগঞ্জ-২)।
নরসিংদী-১ আসনে বিএনপির খায়রুল কবীর খোকন, নরসিংদী-২ আসনে জয়ী বিএনপির আবদুল মঈন খান, নরসিংদী-৩ আসনে আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মনজুর এলাহী, নরসিংদী-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, নরসিংদী-৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল, গোপালগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিমুজ্জামান মোল্লা, গোপালগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী কে এম বাবর, গোপালগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এস এম জিলানী।
হবিগঞ্জ-১ আসনে বিজয়ী হয়েছেন রেজা কিবরিয়া। বগুড়া-২ আসনে মীর শাহে আলম, বগুড়া-৪ এ মোশারফ হোসেন, ফরহাদ হোসেন আজাদ (পঞ্চগড়-২), শফিকুর রহমান কিরন বিজয়ী হয়েছেন শরীয়তপুর-৩ আসনে।
কিশোরগঞ্জে ৬টি আসনের মধ্যে ৫টিতে জয়লাভ করেছে বিএনপি। তারা হলেন- মাজহারুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ-১), জালাল উদ্দীন (কিশোরগঞ্জ-২), ড. ওসমান ফারুক (কিশোরগঞ্জ-৩), অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান (কিশোরগঞ্জ-৪), শরীফুল আলম (কিশোরগঞ্জ-৬)। এই জেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল জয়ী হয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে।
অন্যদিকে বিএনপি সমর্থিত গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী জুনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন।
জামায়াত: দলটির প্রার্থীদের মধ্যে হলেন জহিরুল ইসলাম (চট্টগ্রাম-১৬), সালাউদ্দীন আইউবী (গাজীপুর-৪), রায়হান সিরাজী (রংপুর-১), এটি এম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২), মাহবুবুর রহমান বেলাল (রংপুর-৩), গোলাম রব্বানী (রংপুর-৫), আনোয়ারুল ইসলাম (কুড়িগ্রাম-১), মাহবুবুল আলম সালেহী (কুড়িগ্রাম-৩), মুস্তাফিজুর রহমান মুস্তাক (কুড়িগ্রাম-৪), শফিকুল ইসলাম মাসুদ (পটুয়াখালি-২) বিজয়ী হয়েছেন।
এনসিপি: দলটির বিজয়ীরা হলেন আখতার হোসেন (রংপুর-৪), আতিক মুজাহিদ (কুড়িগ্রাম-২), হান্নান মাসুদ (নোয়াখালি-৬)।
খুলনা বিভাগে বিজয়ী যারা: খুলনা-২ আসনে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা-৪ আসনে বিএনপির এস কে আজিজুল বারী, খুলনা-৫ আসনে বিএনপির মোহাম্মাদ আলী আসগার, বাগেরহাট-১ আসনে জামায়েতের মাওলানা মশিউর রহমান খান, বাগেরহাট-২ আসনে জামায়াতের শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ, বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট-৪ আসনে জামায়াতের অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম। সাতক্ষীরা-১ আসনে জামায়াতের মো. ইজ্জত উল্লাহ (দাঁড়িপাল্লা), সাতক্ষীরা-২ আসনে জামায়াতের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনে জামায়াতের হাফেজ রবিউল বাশার, সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতের জিএম নজরুল ইসলাম। যশোর-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আজিজুর রহমান, যশোর-২ আসনে জামায়াতের মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, যশোর-৩ আসনে বিএনপির অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, যশোর-৪ আসনে জামায়াতের গোলাম রসুল, যশোর-৫ আসনে জামায়াতের গাজী এনামুল হক, যশোর-৬ আসনে জামায়াতের মোক্তার আলী, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মাসুদ পারভেজ রাসেল, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর রুহুল আমীন, নড়াইল-১ আসনে বিএনপির জাহাঙ্গীর আলম, নড়াইল-২ আসনে জামায়াতের আতাউর রহমান বাচ্চু, ঝিনাইদহ-১ আসনে বিএনপির মো. আসাদুজ্জামান, ঝিনাইদহ-২ জামায়েতের জামায়াতে ইসলামীর আলী আজম মোহাম্মদ আবু বকর, ঝিনাইদহ-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর অধ্যাপক মতিয়ার রহমান, ঝিনাইদহ-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আবু তালেব, মাগুরা-১ আসনে বিএনপির মনোয়ার হোসেন খান, মাগুরা-২ আসনে বিএনপির নিতাই রায় চৌধুরী, কুষ্টিয়া-১ আসনে বিএনপির রেজা আহামেদ, কুষ্টিয়া-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল গফুর, কুষ্টিয়া-৪ আসনে জামায়াতের আফজাল হোসেন, মেহেরপুর-১ আসনে জামায়াতের মাওলানা তাজ উদ্দিন খান, মেহেরপুর-২ আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াতের নাজমুল হুদা।
বিএনপির ক্ষমতার ইতিহাস সর্বশেষ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফাপত্র প্রদানের মাধ্যমে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া এই দলটিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যান। দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
তারেক রহমানের অভিষেক ও নেতৃত্ব বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, দল ক্ষমতায় গেলে বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। এবারই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন এবং ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬-উভয় আসনেই জয়লাভ করেন।
বিগত ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান এবং ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। বিএনপির ওয়েবসাইট ও মিডিয়া সেলের তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তাঁর আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের সংস্কৃতি চালু করে তিনি তৃণমূল রাজনীতিতে সাড়া ফেলেন। ২০০২ সালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
সংসদীয় সমীকরণ বাংলাদেশে সরকার গঠনের জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অন্তত ১৫১টি আসনে জয়ের প্রয়োজন হয়। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি এককভাবেই সেই সংখ্যা অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে, এবারই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এর আগে জামায়াত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরকার ও বিরোধী দলে থাকলেও এবারই প্রথম তারা প্রধান বিরোধী শক্তির মর্যাদা পেতে যাচ্ছে।