ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত

এফএনএস (সৈয়দ জাহিদুজ্জামান; দিঘলিয়া, খুলনা) :
| আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম | প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত

‎“ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত”-বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়-এর এই অমর পঙ্ক্তি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য আশাবাদী ঘোষণা। প্রকৃতির রঙিন উৎসবের চেয়েও বড় হয়ে এখানে উচ্চারিত হয়েছে মানুষের মনের জাগরণ। ফুল ফুটেছে কি না, কোকিল ডেকেছে কি না-তা মুখ্য নয়; মুখ্য হলো মানুষের অন্তরের নবপ্রাণের স্পন্দন। বাংলা ঋতুচক্রে বসন্ত মানেই ফাল্গুন-চৈত্রের সোনালি আলো, সরিষাক্ষেতের হলুদ ঢেউ, পলাশ-শিমুলের অগ্নিরঙা উচ্ছ্বাস। চারদিকে গাছে গাছে নতুন নতুন পাতার সবুজ পাতার সমারোহ, বাতাসে কচি আম্রকুঞ্জের গন্ধ, তরুণ-তরুণীদের রঙিন পোশাকে উৎসবের আমেজ। শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার। বাবা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, দাদা-নাতী সবার মাঝে যেন বসন্তের এই প্রাকৃতিক স্পন্দন অজানা অদেখা এক আকর্ষণ কাছে টানতে চাই। এ আকর্ষণটা যেন প্রকৃতির অমূল্য দান। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বসন্ত কেবল এই দৃশ্যমান সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বসন্তকে দেখেছেন মানসিক ও আত্মিক জাগরণের প্রতীক হিসেবে। প্রকৃতির ফুল না ফুটলেও, যদি মানুষের মনে সাহস ও স্বপ্নের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে-তবে সেটাই প্রকৃত বসন্ত। সমাজ-বাস্তবতার কঠিন প্রেক্ষাপটে এই পঙ্ক্তির তাৎপর্য আরও গভীর। ইতিহাস সাক্ষী, প্রতিটি সংকটময় সময়ে মানুষ আশার আলো খুঁজেছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা ব্যক্তিগত হতাশা-যে কোনো অন্ধকারের মাঝেও যদি কেউ দৃঢ় কণ্ঠে বলতে পারে “আজ বসন্ত”, তবে সেই উচ্চারণই পরিবর্তনের সূচনা। এখানে বসন্ত মানে শুধু ঋতু পরিবর্তন নয়; মানে মানসিক বিপ্লব। পুরনো ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন পথে হাঁটার সাহস। এই পঙ্ক্তি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়-অপেক্ষা নয়, আত্মবিশ্বাসই পরিবর্তনের প্রথম শর্ত। নজরুলের কবিতায় প্রেম ও বিদ্রোহ পাশাপাশি চলেছে। তাঁর বসন্তে যেমন রোমান্টিক আবেগ আছে, তেমনি আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর। মানুষের অন্তরে যখন মানবতার জাগরণ ঘটে, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গর্জে ওঠে-সেখানেও বসন্তের আগমন ঘটে। এই বসন্ত কেবল ফুলের নয়, মুক্তচিন্তার; কেবল রঙের নয়, স্বাধীনতার; কেবল উৎসবের নয়, মানবিক চেতনার। সমকালীন বিশ্বে অনিশ্চয়তা ও প্রতিযোগিতার চাপ মানুষের মনকে প্রায়শই ক্লান্ত করে তোলে। ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতা কিংবা সামাজিক সংকট আমাদের হতাশ করে। ঠিক তখনই সুভাষের এই পঙ্ক্তি হয়ে ওঠে এক অনুপ্রেরণার মন্ত্র। ফুল হয়তো এখনো ফুটেনি, কিন্তু সম্ভাবনার বীজ মাটির নিচে অঙ্কুরিত হচ্ছে। তাই আশাবাদ হারিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই। জীবনের প্রতিটি নতুন সকাল, প্রতিটি সাহসী সিদ্ধান্ত-একেকটি বসন্তের সূচনা। “ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত”-এই উচ্চারণ কেবল কবিতার অলংকার নয়; এটি জীবনদর্শন। প্রকৃত বসন্ত বাহ্যিক ফুলে নয়, অন্তরের নবজাগরণে। মানুষ যতদিন আশা নিয়ে বাঁচবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, প্রেম ও মানবতাকে ধারণ করবে-ততদিন বসন্ত ফিরে আসবে বারবার। ফুল ফুটুক বা না-ই ফুটুক, হৃদয়ে যদি নবজাগরণের আলো জ্বলে ওঠে-তবে আজই বসন্ত।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে