গোলাপের ভেতর লুকানো চিঠি

তালহা রহমান | প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
গোলাপের ভেতর লুকানো চিঠি

১৪ ফেব্রুয়ারির সকাল। ঢাকার আকাশে নরম রোদ, বাতাসে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। চারদিকে লাল আর সাদা রঙের ছোঁয়া। আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। শহরের কফিশপ, বইয়ের দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস-সব জায়গায় যেন এক নীরব উৎসব। 

অর্ণব খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছিল। আজ তার ভেতরে অকারণ এক অস্থিরতা। সে কখনও ভালোবাসা দিবসকে খুব গুরুত্ব দেয়নি। বরং বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে বলত, “ভালোবাসা কি একদিনে হয়?”কিন্তু এ বছর কথাটা বলতে গিয়ে নিজেরই কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল।

কারণ, এ বছর তার জীবনে আছে মেহরিন।

মেহরিন তার সহপাঠী। প্রথম বর্ষে পরিচয়। প্রথমে শুধু নোট শেয়ার করা, লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসা, গ্রুপ প্রেজেন্টেশনে একসঙ্গে কাজ-এভাবেই শুরু। কিন্তু ধীরে ধীরে অর্ণব বুঝতে পারে, মেয়েটির হাসি তার দিনের ক্লান্তি কমিয়ে দেয়। মেহরিনের চোখে একটা শান্ত স্বচ্ছতা আছে, যা তাকে নির্ভার করে।

তবু সে কখনও কিছু বলেনি। ভয়-বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যাবে।

সকাল দশটার দিকে অর্ণব নিউমার্কেটের এক ফুলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। দোকানদার বলল, “ভাই, লাল গোলাপ নিবেন? আজকে স্পেশাল অফার।” অর্ণব হালকা হেসে মাথা নেড়ে একটা ছোট তোড়া নিল। কিন্তু গোলাপের থেকেও বেশি যত্ন করে সে পকেটে রাখল ছোট একটা খাম। খামের ভেতর তার নিজের হাতে লেখা চিঠি।

চিঠিটা খুব বড় নয়। তাতে সে লিখেছে-

“মেহরিন,

ভালোবাসা দিবসে সবাই অনেক বড় বড় কথা বলে। আমি শুধু একটা কথা বলতে চাই-তোমার পাশে থাকতে ভালো লাগে। যদি কখনও তোমার কষ্ট হয়, আমি চাই তুমি প্রথমে আমাকে জানাও। যদি কখনও তুমি খুশি হও, আমি চাই সেই হাসিটা আমি কাছ থেকে দেখি। এটাকে প্রেম বলো, ভালো লাগা বলো-নামটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তুমি থাকলেই দিনটা আলাদা লাগে।”

দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে দেখা হলো তাদের। চারদিকে জোড়া জোড়া মানুষ, কেউ ছবি তুলছে, কেউ হাসছে, কেউ আবার চুপচাপ বসে আছে। মেহরিন আজ সাদা শাড়ি পরেছে, লাল পাড়। খুব সাধারণ, কিন্তু অর্ণবের চোখে অসাধারণ।

“আজ তো তুমি খুব সাজগোজ করেছ,” অর্ণব মজা করে বলল।

মেহরিন হেসে উত্তর দিল, “বিশেষ দিন বলে কথা। তবে তুমি কেন এত নার্ভাস দেখাচ্ছ?’’

অর্ণব একটু থমকাল। তারপর হঠাৎ করেই গোলাপের তোড়াটা এগিয়ে দিল। “এটা তোমার জন্য।”

মেহরিন অবাক হলো। “তুমি? তুমি তো এসব পছন্দ করো না!’’

“হয়তো কিছু কিছু জিনিস মানুষ বদলে দেয়,” অর্ণব ধীরে বলল।

মেহরিন তোড়াটা নিল। গোলাপের ভেতর লুকানো খামটা তখনও সে খেয়াল করেনি। তারা কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল। আশেপাশে হাসির শব্দ, ক্যামেরার ক্লিক, বিক্রেতাদের ডাক-সবকিছু মিলিয়ে যেন এক উৎসবমুখর কোলাহল। কিন্তু তাদের দু’জনের মাঝে ছিল এক অদ্ভুত নীরবতা।

হঠাৎ মেহরিন বলল, “অর্ণব, তুমি জানো? আমি ভালোবাসা দিবসকে খুব বিশেষ মনে করি না। কারণ, যদি কেউ সত্যিই পাশে থাকে, তাহলে প্রতিদিনই তো ভালোবাসার।”

অর্ণবের বুক ধক করে উঠল। সে কি তবে ভুল করছে?

কিন্তু মেহরিন কথা চালিয়ে গেল, “তবে আজ একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”

“কি কথা?”অর্ণবের গলা শুকিয়ে এল।

মেহরিন তার ব্যাগ থেকে একটা ছোট বাক্স বের করল। ভেতরে একটা বুকমার্ক-কাঠের তৈরি, তাতে খোদাই করা: “ঝঃধু.’’

“তুমি যখন প্রথম দিন লাইব্রেরিতে আমাকে সিট ছেড়ে দিয়েছিলে, তখন থেকেই মনে হয়েছিল তুমি আলাদা। তুমি কখনও বাড়াবাড়ি করো না, কখনও অযথা নাটক করো না। কিন্তু চুপচাপ পাশে থাকো। আমি চাই তুমি থাকো।”

অর্ণব অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। “মানে?’’

মেহরিন হেসে বলল, “মানে, যদি তুমি চাও-আমরা চেষ্টা করতে পারি। বন্ধুত্ব নষ্ট না করে, একটু অন্যরকমভাবে।”

অর্ণবের মনে হলো চারপাশের সব শব্দ থেমে গেছে। সে শুধু মেহরিনের চোখ দুটো দেখছে। সেখানে ভয় নেই, দ্বিধা নেই-শুধু একটুখানি আশা।

“আমি চাই,” অর্ণব ধীরে বলল।

মেহরিন তখন গোলাপের তোড়াটা নেড়ে দেখছিল। খামটা চোখে পড়তেই সে অবাক হয়ে খুলল। চিঠিটা পড়ে তার চোখে জল চিকচিক করল।

“তুমি এতদিন কিছু বলোনি কেন?” সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

অর্ণব হেসে বলল, “ভেবেছিলাম, সময়টা নিজেই বলে দেবে।”

মেহরিন চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল। “আজ সময়টাই বলে দিল।”

সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে। লাল আভা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে গেছে-ঠিক গোলাপের পাপড়ির মতো। চারদিকে এখনও ভালোবাসা দিবসের উচ্ছ্বাস, কিন্তু তাদের দু’জনের কাছে দিনটা হয়ে উঠেছে অন্যরকম-নিঃশব্দ, আন্তরিক, গভীর।

সেদিন তারা কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ভবিষ্যতের বড় স্বপ্নও দেখেনি। শুধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল-একজন আরেকজনের পাশে থাকবে, যতটা সম্ভব সৎ থেকে।

ভালোবাসা দিবস তাদের জন্য কেবল একদিনের উদযাপন হয়ে থাকেনি। সেটি হয়ে উঠেছিল এক নতুন শুরু-যেখানে ভালোবাসা মানে শুধু গোলাপ নয়, বরং সাহস করে হৃদয়ের কথা বলা।

আর সেই গোলাপের ভেতর লুকানো ছোট্ট চিঠিটাই হয়ে রইল তাদের গল্পের প্রথম অধ্যায়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে