পাখির খাবারের জন্য পঞ্চাশ শতক জমিতে চাষাবাদ করা হয়েছে কলা গাছসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। দুটি পুকুরে চাষ করা হয়েছে মাছ। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রায় ৪০ বছর ধরে দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল স্কুল শিক্ষক আখতারুজ্জামানের বিশাল বাড়ি। লাখ লাখ পাখির নিরাপদ এই আবাসস্থলকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন সরকারিভাবে নামকরণ করেছে বিহঙ্গ বিলাস। আর এ পাখি বাড়ি এখন সারাদেশে মানুষের কাছে আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রাণী কল্যান সংগঠনের সদস্যরা বলেন, এ পাখা বাড়ি এখন কলাপাড়া উপজেলার মডেল। আর উপজেলা সহকারী কমিশনার বলেন,বন্য পাখি ও প্রাণীদের সুরক্ষায় পাখি প্রেমী স্কুল শিক্ষককে সব ধরনের সহায়তা করবে জেলা প্রশাসন। পাখির চোখে কলাপাড়ায় স্কুল শিক্ষকের পাখি বাড়ি। বিশাল বাড়িতে বড় বড় গাছে হাজার হাজার পাখির বাসা। কোথাও বক, কোথাও পানকৌড়ি। কোথাও বা গাছে ঝুলছে বাদুড়। টিয়া, শালিক, ময়না, ঘুঘু থেকে শুরু করে দেশীয় ও পরিযায়ী প্রজাতির অন্তত ৫০ ধরনের পাখির বাসা রয়েছে। সারাদিন পাখির কিচিরমিচির। এরমধ্যেই স্ত্রী, দুই সন্তান ও বাবা-মা নিয়ে বসবাস করে শিক্ষক আখতারুজ্জামান। বিশাল বাড়ির সর্বত্র কলা, পেয়ারা, আম থেকে শুরু করে লিচু, কাঁঠাল, আমড়া, জলপাই, তেঁতুল,বরইসহ সব ঋতুতে উৎপাদন হয় এমন ফলের গাছ রোপন করা হয়েছে। বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা পাখির খাবারের জন্য দুটি পুকুরে ছোট ছোট বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হয়েছে। আর এ পুকুর ও ফলের গাছে সারাদিনই উড়ে বেড়ায় পাখিরা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ঝড়ো বাতাসে গাছের পাখির বাসা থেকে পাখির ছোট ছানা পড়ে গেলে তা পরম মমতায় আবার বাসায় তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করে এই শিক্ষক ও তার সন্তান। স্কুল শিক্ষক মো. আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষকতা পেশার অবসরে পাখিদের সেবা সুশ্রুসা করেই তাদের দিন চলে যায়। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন তাদের বাবা-মা পাখিদের পরম মমতায় খাবার দিত। কোন পাখি শিকারী কে বাসার আশেপাশে আসতে দিতো না। বাবা মাকে দেখে দেখে তারাও পাখি প্রেমে পড়ে যান। স্কুলজীবন থেকেই পাখিদের যত্ন নিতে শুরু করেন। এখন তাদের বাসা উপজেলা জুড়ে পাখি বাড়ি নামে পরিচিত। তিনি বলেন, পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির কলোনী’ লেখা সাইনবোর্ড স্থাপন করে বাড়িটির নামকরণ করা হয় ‘বিহঙ্গ বিলাস’। এতে তাদের আরো বেড়ে গেছে। বন্য পাখিদের সুরক্ষায় তারা আরো আন্তরিকতার সাথে কাজ করবেন বলে জানান। পিতার দেখানো পথ অনুসরণ করে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আতুবুজ্জামান আদিলও পড়ালেখার অবসরে পাখিদের যত্ন করে সময় কাটায়। যে বয়সে তার সহপাঠীদের সাথে মাঠে খেলা করার কথা, সে সময় সে খুঁজে পেলে কোন পাখি অসুস্থ, কোন পাখির বাচ্চা নিচে পড়ে গেছে তা দেখতে। বাগানে ফল কমে গেলে তার জন্য নিয়ে আসা ফলও পাখিদের খাবারে দিয়ে দেন। স্কুল ছাত্র আদিল জানায়, যখন বন্যা হয় বা ঝড়ো বাতাস হয় তখন তার খুব মন খারাপ হয়। অনেক সময় পাখির বাসা ভেঙে পাখির বাচ্চা নিচে পড়ে যায়। পাখির ডিম পড়ে ভেঙ্গে যায়। যা দেখে তার খুব মন খারাপ হয়। তবে তাদের পাখি বাড়িতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে দেখতে। এ পাখি বাড়ির প্রতিটি গাছের শাখা-প্রশাখার ভাঁজে, পাতার নিচে খড়কুটো দিয়ে তৈরি করা হাজার হাজার পাখির বাসা। এই বাসাগুলোতে পাখির ছানারা কখনো সরব, কখনো নিশ্চুপ। কোনোটিতে মা বক পাখি বসে ডিমে তা দিচ্ছে। কোনো বাসায় মা ছানাদের মুখে তুলে দিচ্ছে সংগ্রহ করে নিয়ে আসা খাবার। যা দেখতে আসছে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীসহ সব বয়সের মানুষ। কলাপাড়ায় বন্য পাখি ও প্রাণীদের সুরক্ষায় দীর্ঘ বছর ধরে কাজ করছে প্রাণী কল্যাণ সংগঠন এনিমেল লাভারস অব পটুয়াখালী। এ সংগঠনের বায়েজিদ মুন্সী বলেন, তারা চেষ্টা করেছেন এ পাখি বাড়িকে পাখির অভয়াশ্রম করতে। আজ জেলা প্রশাসনের নির্দেশ কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসম স্কুল শিক্ষকের পাখি প্রেমকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ায় তারা খুশি। কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদিক বলেন, শিক্ষকের পাখি প্রেম নিয়ে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হলে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে সরেজমিনে পাখি বাড়ি ঘুরে দেখে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিদের অভয়াশ্রম দেখতে পান। পাখিদের প্রতি শিক্ষক পরিবারের এই আন্তরিকতা দেখে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মহোদয় দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসাবে এই পাখি বাড়িকে বিহঙ্গ বিলাস হিসেবে নামকরণ করেন। এ বাড়িতেই সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাখি প্রেমের বাস্তব দৃষ্টান্ত এই শিক্ষক পরিবারকে সরকারি সবধরনের সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে বলে জানান। কলাপাড়ার বালিয়াতলী ইউনিয়নের মুসুল্লীয়াবাদ গ্রামে বাড়ি শিক্ষক আখতারুজ্জামানের। আনুষ্ঠানিকভাবে এ বাড়িকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করায় বণ্য পাখির সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন পশুপ্রেমীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।