তোমাকে না লেখা চিঠিটা ডাকবাক্সের এক কোণে সাদা খামের না লেখা নাম এঁকেছে তার গানে, সেই চিঠি যত লেখা থাকে একা একা বা চিঠি দিও প্রতিদিন চিঠি দিও এ ভাষা এখন আর নেই।এমন গানের কথার মতো করেই হৃদয়ের সমস্ত আবেগ দিয়ে প্রিয়জনের কাছে লেখা হতো চিঠি। সেই চিঠি ফেলা হতো পোষ্ট অফিসের লাল রঙের ডাকবাক্সে। সেখান থেকে পোস্ট মাস্টারের হাত ধরে পৌঁছে দিত প্রিয়জনদের কাছে। প্রিয়তমার চিঠি, প্রেমিকের চিঠি,মায়ের চিঠি,বাবার কাছে সন্তানের চিঠি।এমনকি দাফতরিক বিভিন্ন দরকারি চিঠি।কালের আবর্তনে হারিয়ে গেছে সেই চিঠি আদান প্রদান। অযত্ন-অবহেলায় লাল রঙের ডাক বাক্স হারিয়েছে তার জৌলুশ আবেদন।
একটা সময় ছিল যখন যোগাযোগ বলতে বোঝানো হতো হাতে লেখা চিঠি, ডাক পিয়নের অপেক্ষা আর ডাকবাক্সে জমা থাকা ভালোবাসার বার্তা। রাজাদের রাষ্ট্রীয় বার্তা আদান-প্রদান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম ছিল এই চিঠি। সময়ের পরিক্রমায় প্রযুক্তির ছোঁয়ায় চিঠি লেখা আজ বিলুপ্তির পথে,প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় সেই ডাকবাক্স আজ প্রায় অব্যবহৃত, আর চিঠি লেখা যেন এক স্মৃতিকথায় পরিণত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিক ডাকব্যবস্থার সূচনা ঘটে। ১৭৬৬ সালে ব্রিটিশরা প্রথম ডাকব্যবস্থা চালু করে এবং ১৮৫৪ সালে আধুনিক ডাকটিকিট প্রবর্তন করে। শহর ও গ্রামে ডাকবাক্স স্থাপন করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ চিঠি পোস্ট করতে পারত। ঘোগড়ার গাড়ি,স্টিমার ও পরবর্তীতে রেলগাড়ির মাধ্যমে ডাক পরিবহন আরও গতিশীল হয়।সুনির্মল বসুর“রানার”কবিতায় চিঠি পরিবহনের কঠোর বাস্তবতা ফুটে উঠেছে।সেই রানার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটত,বৃষ্টিতে ভিজত,ঝড়ে পথ হারাত—তবু তার গন্তব্যে পৌঁছানোর এক অদম্য শক্তি ছিল। আজ প্রযুক্তির কারণে সেই দৃশ্য হারিয়ে গেছে। প্রযুক্তির কারণে চিঠির ব্যবহার অনেক কমে গেছে। মোবাইল, ইমেইল, মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ সহজেই যোগাযোগ করতে পারে। ফলে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ শহরে ডাকবাক্স ফাঁকা পড়ে রয়েছে, আর রানার বা ডাকপিয়নের গুরুত্ব হারিয়ে গেছে।ডাকবাক্সটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার কারনে লতাপাতা আকড়িয়ে ধোরে রেখেছে।যদিও চিঠি লেখা আজ কমে এসেছে, তবু চিঠির প্রতি মানুষের ভালোবাসা মুছে যায়নি।অনেকেই এখনো হাতে লেখা চিঠির গন্ধ, অনুভূতি আর অপেক্ষার রোমাঞ্চকে স্মরণ করে। প্রেমপত্র, মায়ের লেখা চিঠি, বন্ধুর দূরদেশ থেকে পাঠানো সংবাদ এসবকিছুই ছিল এক অমূল্য স্মৃতি। অনেকে পুরোনো চিঠি জমিয়ে রাখে, কখনো কখনো হয়তো তা খুলে পড়ে পুরোনো দিনগুলোর ছোঁয়া খোঁজে।ঠিক এমনই ভাবে ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ শহরে প্রধান ডাকঘর (৭৩৫০ কোড) চোখে পড়ে না সেই লাল রঙের ডাকবাক্স গুলোতে চিঠি ফেলতে। কাঁধে খাকি রঙের বস্তা নিয়ে গ্রামের পথে ডাক হরকরার ছুটে চলার দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। ডাকঘরে খাম, পোস্টকার্ড, ডাকটিকিট থাকলেও তা বিক্রি কমেছে অনেক।
কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম এলাকায় ডাক বিভাগের শাখা অফিস রয়েছে কিন্তু সে গ্রলোর অবস্থা এখন কালের স্বাক্ষী হয়ে রয়েছে। কালীগঞ্জ উপজেলার মানুষ মনে করেন, ডাক বিভাগের সেবাগুলো বেশিরভাগ এখনও এনালগ পদ্ধতির হওয়ায় সেগুলো চাহিদা অনুযায়ী সময়োপযোগী ও তুলনামূলক গুণগত মানসম্পন্ন সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে পারছে না। ইতোপূর্বে ডাক বিভাগের সেবার ধরনে পরিবর্তন ও কিছু সেবা আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেসব বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি নেই। তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলতে পারায় ডাক বিভাগ থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানসহ জনগণ মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। একসময় চিঠি, পার্সেল, মানি অর্ডার, ডাকঞ্চয়, বেতার, টিভির লাইসেন্স, মোটর গাড়ির লাইসেন্স, ফি এসব ডাকঘরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এখন ব্যক্তিগত চিঠি লেখা হয় মোবাইলের মাধ্যেমে, পার্সেলের কাজ বেশি হয় বেসরকারি সংস্থাগুলোর কুরিয়ার সার্ভিসে। মানি অর্ডারের কাজ বেশি হয় মোবাইল ব্যাংকিংয়ে, সঞ্চয় গেছে ব্যাংকে। ডাকঘরে সঞ্চপত্র ও প্রাইজ বন্ড বিভাগ চালু থাকলেও তাতে তেমন রাজস্ব নেই।