বাচ্চারা বলে ইলিশ মাছ আনতেৃ কিন্তু আমি কীভাবে আনব দাম শুনলেই বুকটা কেঁপে ওঠে কথাগুলো বলতে বলতে চোখ মুছছিলেন বরিশাল নগরীর এক সাধারণ ক্রেতা আলমগীর। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকজন রিয়াজুর কবির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ইলিশ এখন আর গরিবের মাছ না, এটা এখন স্বপ্নের মতো।
বৈশাখ মানেই বাঙালির জীবনে ইলিশ আর পান্তার এক অবিচ্ছেদ্য উৎসব। কিন্তু এবারের বৈশাখ যেন অনেকের ঘরে কেবলই দুশ্চিন্তা আর হিসাব-নিকাশের গল্প লিখছে।বরিশালের বাজারে ইলিশ আছে, কিন্তু সেই ইলিশ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে দাম যেন স্বর্ণের মতো বেড়ে গেছে।
বরিশাল নগরীর পোর্ট রোড ইলিশ মোকামে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবারের মতো ঝুড়িভরা ইলিশের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। বাজারে অল্প কিছু মাছ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারা আসছেন, মাছ দেখছেন, দাম শুনছেন আর নীরবে মাথা নিচু করে ফিরে যাচ্ছেন। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার টাকায়। এক সপ্তাহ আগেও এই মাছের দাম ছিল প্রায় দেড় হাজার টাকা কম। ৭০০-৮০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ৩ হাজার টাকা, ৫০০ গ্রাম ২ হাজার টাকা, ৪০০ গ্রাম ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৩০০ গ্রামের মাছ ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ছোট জাটকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকায়।
এক ক্রেতা সবুজ হাওলাদার আক্ষেপ করে বলেন, ইলিশ কিনতে এসে মনে হচ্ছে যেন কোনো বিলাসী জিনিস কিনতে এসেছি। হাতে টাকা নেই, আবার বাসার থেকে ইলিশ নিতে বলছেন এখন কিছু বলতে পারি না। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা আকতার হোসেন জানান, এবারের বৈশাখে চাহিদা থাকলেও বাজারে মাছ নেই। চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ মাছও আসছে না। সমুদ্র থেকে মাছ কম আসছে, নদীতেও আগের মতো ইলিশ নেই। পাইকারি ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার বরিশালে ইলিশ সরবরাহ প্রায় ৯৯ শতাংশ কমে গেছে। বরিশাল জিয়া মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ মন ইলিশ আসত, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ২০ মনের মতো। এই সংকটের পেছনে রয়েছে গভীর কিছু কারণ। মৎস্য বিশেষজ্ঞ আলম হাচান বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ নিধন, নদ-নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, পানির স্রোত কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, জাটকা নদী থেকে সমুদ্রে যেতে না পারায় সেগুলো আগেই ধরা পড়ে যাচ্ছে। ফলে মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। পাশাপাশি কৃষিজমির কীটনাশক নদীর পানিতে মিশে দূষণ তৈরি করছে, যা মাছের পোনা ধ্বংস করছে। বরিশালের চরবাড়িয়া এলাকার জেলে আবদুর রহমান বলেন,নদীতে এখন মাছ নেই বললেই চলে। জাল ফেললেও খালি হাতে ফিরতে হয়। আগে যে নদীতে সংসার চলত, এখন সেই নদী আমাদের কাঁদায়। নদী দূষণ ও ডুবোচর দ্রুত অপসারণ না করলে ভবিষ্যতে ইলিশ পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ জানান, অভ্যন্তরীণ নদীতে চর জেগে ওঠায় জাটকা সমুদ্রে যেতে পারছে না। ফলে ছোট ইলিশ আগেই ধরা পড়ছে এবং বড় হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে। সমুদ্র থেকেও মাছের সরবরাহ কমে গেছে। তবে দাম নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা না থাকলেও বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিতে পারে।