বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাণদায়িনী বারনই নদী আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। একসময় এ নদীর পানি ছিল কৃষকের আশীর্বাদ, জেলের জীবিকা ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রেরণার উৎস। নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল জনপদ, কৃষি ছিল সমৃদ্ধ, সংস্কৃতি ছিল জীবন্ত। কিন্তু আজ সেই বারনই হারাচ্ছে তার স্রোত, হারাচ্ছে জীবন। নদীর বুকজুড়ে চলছে দখল, গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্যে ভরাট হচ্ছে তলদেশ, দূষণে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে জলজ প্রাণ। একসময় যেখানে প্রবাহিত হতো জীবনের সুর, সেখানে আজ নীরবতা আর বর্জ্যের দুর্গন্ধ। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বারনই নদী শুধু মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, হারিয়ে যাবে বাস্তবতা থেকে।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে নওহাটা মহিলা ডিগ্রি কলেজের সভাকক্ষে আয়োজিত ‘জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বারনই নদী রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেছেন।
বক্তারা আরও বলেন, ‘বারনই শুধু একটি নদী নয়; এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের জীবন, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের প্রতীক। আজকে দখল ও দূষণের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে এই অঞ্চলের প্রাণবায়ু বারনই নদী। একসময় বারনই নদী এই অঞ্চলের কৃষি, সংস্কৃতি ও পরিবেশের মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু ক্রমাগত দখল, দূষণ ও পানিস্বল্পতার কারণে নদীটি আজ মৃতপ্রায়। এই নদী রক্ষায় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।’
এর আগে নদীটির অস্তিত্ব রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সকাল সাড়ে ৯টায় নওহাটা শ্মশান ঘাট এলাকায় মানববন্ধন ও গম্ভীরা পরিবেশনের মধ্যদিয়ে এ কর্মসূচির সূচনা হয়। আলোচনা শেষে ‘বাঁচার আশা’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা গম্ভীরা পরিবেশনা করেন। গানের কথায় নদী রক্ষার গুরুত্ব ও পরিবেশ সচেতনতার বার্তা তুলে ধরা হয়। এই কর্মসূচির আয়োজন করে রুলফাও, এএলআরডি ও বেলা সংগঠন। এটি“নদীর জন্য একসাথে—নদী রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ” ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নওহাটা পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির সদস্য শেখ মকবুল হোসেন। সভাপতিত্ব করেন রুলফাও-এর নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন।
এসময় সামাজিক কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী পার্থ সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কবির হোসেন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও বাপা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জামাত খান, বেলা রাজশাহী কার্যালয়ের সমন্বয়কারী তন্ময় স্যানাল, পরিবর্তনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদ রিপন, বিইউকেএস-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিনুর রহমান, এএলআরডি'র প্রতিনিধির হবে সানজিদা খান রিপা, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ওয়ালিউল্লাহ খান বাবু, দিনের আলো হিজড়া সংঘের সভাপতি মোহনা ও বাঁচার আশা সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি মোস্তফা সরকার বিজলী প্রমুখ।
আলোচনা সভায় বক্তারা জানান, রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার বাগধানী এলাকা দিয়ে উৎপত্তি হয়ে নাটোরের সিংড়া উপজেলার শেরকোল দিয়ে আত্রাই নদীতে মিশেছে বারনই। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৩ কিলোমিটার, সর্বোচ্চ প্রস্থ ৯১ মিটার এবং গড় প্রস্থ ৫১ মিটার। এটি রাজশাহী ও নাটোর জেলার আটটি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত। একসময় এই নদীতে চলত লঞ্চ ও বড় বড় নৌকা, কৃষকরা সেচের কাজে ব্যবহার করতেন নদীর পানি। এখন উজানে পানির অভাব, ড্রেজিংয়ের অভাব ও পৌর বর্জ্যে নদীর নাব্যতা হারিয়ে গেছে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, নওহাটা পৌরসভা, ভবানীগঞ্জ, তাহেরপুর ও নলডাঙ্গাসহ আশপাশের এলাকাগুলোর বর্জ্য সরাসরি এই নদীতে পড়ছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও কারখানার বর্জ্যসহ নগরীর পয়ঃবর্জ্য নদীতে পড়ায় এর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে দেশীয় মাছ, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির পথে।