প্রশাসনিক কর্মকর্তার অদক্ষতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা

এফএনএস (ওবায়দুল ইসলাম; সৈয়দপুর, নীলফামারী) : | প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর, ২০২৫, ০৩:০০ পিএম
প্রশাসনিক কর্মকর্তার অদক্ষতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা

দেশের সর্ববৃহৎ রেলওয়ে কারখানা নীলফামারীর সৈয়দপুরে। বর্তমানে এ কারখানাটির এক করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তার অদক্ষতার কারণে কারখানাটি ধ্বংশের পথে। শুধুমাত্র ট্রেনের বগি সংস্কার করে চলছে একটি শপ। অদক্ষ স্থায়ী শ্রমিক নিয়োগের ফলে আরো ধ্বংশের দিকে যাচ্ছে কারখানাটি। দক্ষ শ্রমিক না থাকায় চালু শপে কাজ বন্ধ থাকে। কারখানার ২৯টি উপশপের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ২০টি শপ। যদিও কারখানা কর্তৃপক্ষ এ তথ্যগুলো গোপন রাখছেন কিন্তু সত্য ক্রমান্বয়ে প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে।

অদক্ষ স্থায়ী শ্রমিকরা অনেকে বসে বসে সময় কাটান এবং বেতন ভাতা নিয়ে থাকেন। এদিকে স্থায়ী শ্রমিকদের কাজেই নেই কারখানায় তার ওপর আবার নেয়া হয়েছে কয়েক শত টিএলআর নামে অস্থায়ী শ্রমিক। তারা কি কাজ করেন তাও প্রশ্নবিদ্ধ।

কারখানার ভেতরে চুরি তো আছেই। রং থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক তার পর্যন্ত চলে যায় বাইরে।

রেলওয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে বহিরাগতদের অফিস,বাসা,ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কিছু স্থানে। বলা চলে বৃহৎ এ কারখানাটি চলছে জগাখিচুরীর মধ্যদিয়ে।

শ্রমিকদের অবসর,নতুন নিয়োগ না হওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় সার্বিক কার্যক্রম। দক্ষ জনবল সঙ্কটে অনেক মেশিন বন্ধ থাকায় কারখানায় বিরাজ করছে শুনসান নীরবতা।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার সূত্র মতে, এ কারখানায় মঞ্জুরিকৃত ২ হাজার ৮৫৯ জন শ্রমিকের বিপরীতে বর্তমানে নিয়মিত স্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন মাত্র ৭২৮ জন। বিগত দশ বছরে পর্যায়ক্রমে অবসরে যাওয়ায় নিয়মিত শ্রমিক হ্রাস পেয়ে বর্তমানে শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৩১টি। অথচ সৃষ্ট শূন্যপদের বিপরীতে হয়নি কোনো নতুন নিয়োগ। অবসরের কারণে চলতি বছরেই শূন্যপদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৯০ শতাংশ।

কারখানায় যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক বিভাগে ক্রমবর্ধমান পদ শূন্যতা রোধ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা সচল রাখতে ২০১৪ সাল থেকে এ কারখানায় দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে (টেম্পারিং লেবার রিক্রুটমেন্ট) বা টিএলআর শ্রমিক নেওয়া হয়। তবে ওই সকল শ্রমিক কোন কাজেই জানেন না। অথচ তাদের পিছনে লাখ লাখ টাকা গচ্চা দিয়ে যাচ্ছে সরকার। 

দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনসহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রকৌশলী ও নিয়মিত দক্ষ কারিগরদের অভাবে কর্মদক্ষতায় মুখ থুবরে পড়েছে।

সৈয়দপুর কারখানার ২৯টি শপ (সাব ওয়ার্ককশপ) এসবের মধ্যে বেশ কিছু শপে দেখা যায়, কোন কাজ নেই। দক্ষ শ্রমিক না থাকায়  অন্ধকারে পড়ে আছে শপগুলো। কোন কোন শপ চালু থাকলেও তা নামমাত্র।

উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কিংবা নষ্ট কোচ মেরামতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না বিদ্যমান কারিগররা। ২৯টি শপে ৭৪০টি মেশিন পরিচালনায় নেই কোনো মিস্ত্রি কিংবা দক্ষ শ্রমিক। দক্ষ জনবলের অভাবে বন্ধ থাকছে অনেক মেশিন।

মমিনুল নামে ফাউন্ডি শপের ছাঁটাই কর্মচারী জানান, ২০১৪ সালে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কাজে যোগদান করি। এরই মধ্যে শপের সব মেশিন চালানোর দক্ষতা অর্জন করেছি। হঠাৎ ছাঁটাই হওয়ায় কর্মহীন হয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছি। ওই শপে এখন নিয়মিত ৬জন শ্রমিক কাজ করছে। 

নুরুজ্জামান জানান, ১৯৮৭ সাল থেকে এখানে কাজ করছি। শুরু থেকেই এ শপে ৮৭ জন কাজ করত। অবসর ও শূন্যপদে নিয়োগ না হওয়ায় কেবল ১৩ জনকে নিয়ে রেলের চাকার কাজ মেরামত করতে হচ্ছে। ওয়াগন শপের অবস্থা আরও করুণ। সেখানে ১৬৮ জনের মধ্যে অবসরের পর কেবল ৪ জন কাজ করছে। এ ছাড়া ক্যারেজ শপে ৩৯৫ জন মঞ্জুরিকৃত জনবলের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র ৮৫ জন। জনবল সঙ্কটে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনে সমস্যা হচ্ছে বলে মতামত প্রকাশ করেন ওই শপের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মমিনুল ইসলাম। তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সঙ্কটে উৎপাদনসহ সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে মেইনটেন্যান্সে শিডিউল বিপর্যয় মেরামত দেখা দিয়েছে। বিশেষ ট্রেনের রেক ও বিদেশ থেকে আনা নতুন ট্রেনের অ্যাসেম্বলিং কাজে বিঘ্ন ঘটবে।

এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার শিডিউল দফতরের উর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইনচার্জ) বলেন,দক্ষ শ্রমিক না থাকায় কাজের কোনো গতি নেই। এখন জনবল কম। নতুন নিয়োগ হলেও হাতেকলমে দক্ষ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন কম হবে। তবে কারখানাকে সচল রাখতে আরও দক্ষ জনবল প্রয়োজন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে