দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে- তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা ও দ্রব্যমূল্যের ওপর। প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের জীবন কাটে স্বস্তিতে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের আর্থিক সঙ্গতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন দরিদ্র ও অতিদরিদ্র পরিবারে শুরু হয় অশান্তি। রমজান কবে হবে, এটি তো এক বছর আগেই সবার জানা। কিন্তু সহজে বাজার নিয়ন্ত্রণের কাজটিও সময়মতো করা হয়ে ওঠে না। তাই রমজান এলেই বাজারের পাগলা ঘোড়া আরও জোরসে ছোটে। সরকার যদি আগে থেকেই ব্যবস্থা নেয়, রমজানের বাড়তি চাহিদা বিবেচনা করে আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ ঠিক রাখে, তা হলে হয়তো পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এদিকে আসন্ন রমজান মাস মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। রমজান মাসে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা সংযমের মাধ্যমে আল্লাহ নৈকট্যলাভের আশায় সিয়াম সাধন করে থাকেন। বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম দেশে যেখানে রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্য সীমিত করে রাখে, সেখানে বাংলাদেশে ঠিক এর উল্টো। রোজা আসার আগেই ক্রমাগত বাড়তে থাকে দ্রব্যমূল্য। আমাদের দেশের সিংহভাগই মুসলিম। তাই এ মাসে প্রায় সব পরিবারেই বাড়তি একটি চাহিদা থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই চাহিদা কেন্দ্র করে একশ্রেণির মুনাফালোভী বাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে থাকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোতে রমজান এলেই একটি বিশেষ দৃশ্য দেখা যায়। সৌদিতে রমজানের আগে বড় সুপারমার্কেটগুলো চাল, মাংস, ডাল ও খেজুরে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘রমজান ডিসকাউন্ট ক্যাম্পেইন’ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়। তুরস্কে রমজানের জন্য আলাদা জনকল্যাণমূলক বাজার চালু থাকে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কম দামে বিক্রি করা হয়। এসব দেশে ব্যবসায়ীরা রমজানকে বাড়তি মুনাফার সুযোগ নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সওয়াব অর্জনের সময় হিসেবে দেখেন। অথচ বাংলাদেশে রমজান হয়ে ওঠে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মাসগুলোর একটি, এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীর নৈতিক বৈপরীত্যও। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা রয়েছেন- যারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন। তারা অতিরিক্ত মুনাফার জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন, নানা অজুহাতে দাম বাড়িয়ে দেন। তাদের ঠেকাতে হবে। এর পাশাপাশি বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। আমদানি-সুবিধা দিয়ে হলেও সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা দাম বৃদ্ধি করার সুযোগ পাবেন না। নিত্যপণ্যের দাম কমাতে অবশ্যই সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমরা আশা করি।