স্বাস্থ্য খাতে স্থবিরতা

সর্বজনীন সুরক্ষার পথে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি

এফএনএস | প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
সর্বজনীন সুরক্ষার পথে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতা সাধারণ মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা ব্যয়ের ভারে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে-যা শুধু একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা নয়, বরং গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকেত। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ-ইউএইচসি) অর্জনের পথে দেশের অগ্রগতি গত এক দশকে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। বিশেষজ্ঞদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার মাত্র ৫৪ শতাংশ নিশ্চিত করতে পারছে এবং এই স্কোর ২০১৬ সাল থেকে অপরিবর্তিত রয়েছে। অন্যদিকে, চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৩ শতাংশই জনগণকে নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা দারিদ্র্য ও বৈষম্য আরও গভীর করছে। স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় পরিবারগুলোর সঞ্চয় ও উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কাঠামোগত সংস্কার স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র আমূল বদলে দিতে পারে। থাইল্যান্ডের উদাহরণে দেখা গেছে, ধারাবাহিক নীতিগত প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ জরুরি, যেখানে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি, ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সংলাপে আলোচকরা স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোগত দুর্বলতার দিকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেবা ঘাটতি, ভুল রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং অতিমাত্রায় চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার কারণে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব কমে যাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও সংস্কার উদ্যোগের বাস্তবায়ন না হওয়া রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে। স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার শুধু মানবিক দায় নয়; এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পূর্বশর্ত। কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন করা সম্ভব নয়, আর জনস্বাস্থ্য অবহেলিত হলে সামাজিক অসন্তোষ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। অতএব, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, প্রাথমিক সেবার বিস্তার, বীমাভিত্তিক অর্থায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সমন্বিত কৌশল গ্রহণ জরুরি। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেবল নীতিগত ঘোষণা হয়েই থাকবে। জনগণের সুস্থতা যে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ভিত্তি-এই বাস্তবতা উপলব্ধি করাই এখন সময়ের দাবি।