রাষ্ট্রীয় শিল্প, নদীর মৃত্যু এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

এফএনএস
| আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম | প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৮:০৫ পিএম
রাষ্ট্রীয় শিল্প, নদীর মৃত্যু এবং দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

ফরিদপুরের চন্দনা নদীতে চিনিকলের বর্জ্য মিশে পানিদূষণের অভিযোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়, বরং দেশের রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার প্রতিফলন। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ফরিদপুর চিনিকল থেকে উৎপন্ন দুর্গন্ধযুক্ত কালো বর্জ্যপানি নদীতে গিয়ে পড়ছে, ফলে পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং জনজীবনে তীব্র ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে মিল কর্তৃপক্ষ নদীতে বর্জ্য ছাড়ার বিষয়টি অস্বীকার করছে। এই বিপরীত দাবির মাঝেই প্রশ্ন উঠছে-পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্ব আসলে কার, এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার কাঠামো কতটা কার্যকর? চিনিকল শিল্পে আখ প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি মৌসুমি কার্যক্রম হলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোনো মৌসুমি দায়িত্ব নয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তরল বর্জ্য উৎপন্ন হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই বর্জ্য যদি যথাযথভাবে পরিশোধন না করে উন্মুক্ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, আখ মাড়াই মৌসুমে প্রায় তিন মাস এবং পরবর্তী কয়েক মাস পর্যন্ত বর্জ্যপানির দুর্গন্ধ ও দূষণের প্রভাব থাকে। এটি কেবল নদীর নয়, আশপাশের খাল, ডোবা, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। মিল কর্তৃপক্ষের দাবি-বর্জ্য নিজস্ব এলাকায় সংরক্ষণ করা হয় এবং ব্যবহৃত রাসায়নিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয়-আংশিক সত্য হলেও পর্যাপ্ত নয়। আধুনিক শিল্প ব্যবস্থাপনায় কেবল বিষাক্ত রাসায়নিক নয়, জৈব বর্জ্য, স্থগিত কঠিন পদার্থ ও উচ্চ জৈব রাসায়নিক চাহিদাসম্পন্ন (বিওডি) তরলও পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; সেটির নিয়মিত ও কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শন ও ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক হলেও বাস্তবতা হলো-দেশে শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণে তদারকি ও শাস্তির ধারাবাহিকতা দুর্বল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেক সময় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিবেচনায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব ঘটে, যা পরিবেশ সুরক্ষার নীতি ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নদী বাংলাদেশের জীবনরেখা। একটি রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারণে যদি নদীর পানি কালো হয়ে যায় এবং মানুষ নিত্যদিনের কাজেও তা ব্যবহার করতে না পারে, তবে সেটি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা। এই ঘটনায় জরুরি ভিত্তিতে ইটিপি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছ অডিট, স্থানীয় জনগণের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি চিনিকলসহ সব রাষ্ট্রীয় শিল্পে পরিবেশগত মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না হলে উন্নয়ন আর দূষণের সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যাবে।