অমর একুশে বইমেলা বাঙালির সংস্কৃতি, মননশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের প্রতীক। এটি কেবল একটি বই কেনাবেচার আয়োজন নয়, বরং মুক্তচিন্তা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা ধীরে ধীরে বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এ মেলা নতুন বই প্রকাশ, সাহিত্যিক আদান-প্রদান ও চিন্তার বিনিময়ের এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। বইমেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির মঞ্চ। এখানে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মধ্যে মতবিনিময় হয়, নতুন নতুন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটে। একদিকে এটি পাঠকদের নতুন জ্ঞান ও চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, অন্যদিকে লেখকদের জন্যও নতুন ধারার সাহিত্যচর্চার সুযোগ সৃষ্টি করে। একুশের চেতনার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ মেলা মুক্তচিন্তার প্রসারের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা সমাজকে সামগ্রিকভাবে আলোকিত করতে ভূমিকা রাখে। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের বই এখানে প্রকাশিত হয়, যা জ্ঞানচর্চার জন্য অপরিহার্য। লেখক-পাঠকের পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাধীনতায় সম্মান করার মধ্য দিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের উপলক্ষ হোক এই মেলা। গ্রন্থমেলার আয়োজক এবং ভাষা-শিল্প-সাহিত্য সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে যেহেতু জাতির মানসিক বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধনে বাংলা একাডেমি ভূমিকা রাখছে, এজন্য প্রতিষ্ঠানটি মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশে ভূমিকা রাখিতে পারে। মানসম্মত ও উন্নত প্রকাশনা শিল্পের পূর্বশর্ত দক্ষ সম্পাদক কিংবা সম্পাদনা পরিষদ থাকা, সেখানে প্রকাশনীগুলোর ঘাটতি পূরণে বাংলা একাডেমি এগিয়ে আসতে পারে। আমরা জানি, বর্তমানে প্রকাশনা শিল্প এমনিতেই সংকটকাল অতিক্রম করছে। বিশেষত তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে একটি শ্রেণির মধ্যে বই পাঠের প্রবণতা হ্রাসমান। অন্যদিকে কাগজসহ বই মুদ্রণের ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। সে কারনেও মানসম্মত বই প্রকাশে অধিক মনোযোগ চাই। এই সকল চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জ্ঞানের প্রসারে গ্রন্থ প্রকাশনাকার্যে যারা সংশ্লিষ্ট, তাদের পাশে দাঁড়াতে সরকারি প্রণোদনা, কর অব্যাহতি, ‘পাইরেটেড’ বই বিক্রয় বন্ধসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। অমর একুশে গ্রন্থমেলা সাধারণত সরকার প্রধান উদ্বোধন করে থাকেন; এবার তেমনি উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এই বার্তা দেয় বই ও জ্ঞানচর্চা জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য ভিত্তি। অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সেইসঙ্গে নাগরিকের বোধ ও বৌদ্ধিক উৎকর্ষ সাধনও জরুরি।