আয়াতুল্লাহ খামেনির লৌহকঠিন শাসনের অবসান

এফএনএস অনলাইন ডেস্ক: | প্রকাশ: ১ মার্চ, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম
আয়াতুল্লাহ খামেনির লৌহকঠিন শাসনের অবসান
ছবি, সংগৃহিত

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার প্রথম দিনেই নিহত হয়েছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে মাত্র দুজন সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের একজন ছিলেন খামেনি, যিনি গত তিন দশক ধরে ক্ষমতায় ছিলেন-বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা নেতাদের অন্যতম।

সর্বোচ্চ নেতার পদটি ইরানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তিনি এলিট রেভল্যুশনারি গার্ডসহ সব নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। জটিল ক্ষমতার কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে তিনি জননীতির যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো দিতে এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থী বাছাই করতে পারতেন।

তরুণ প্রজন্মের ইরানিরা খামেনিকে ছাড়া অন্য কোনো শাসন দেখেনি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার প্রতিটি কর্মকাণ্ড প্রচার হতো; জনসমাগমস্থল, দোকানপাট-সর্বত্র তার ছবি ছিল দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রেসিডেন্টরা আলোচনায় থাকলেও, দেশীয় রাজনীতির মূল সুতো টানতেন খামেনিই।

শৈশব থেকে বিপ্লব

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন খামেনি। ধর্মীয় পরিবারে বেড়ে ওঠা খামেনি অল্প বয়সেই কোরআন শিক্ষায় দীক্ষিত হন এবং ১১ বছর বয়সে ধর্মীয় শিক্ষায় যোগ্যতা অর্জন করেন। তিনি ইরানের শাহবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।

ইসলামি বিপ্লবের পর বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি তাকে তেহরানের জুমার খতিব নিয়োগ দেন। তার রাজনৈতিক ভাষণ দেশজুড়ে সম্প্রচারিত হতো এবং তিনি দ্রুত নতুন শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠেন।

যুদ্ধ, হামলা ও উত্থান

১৯৮১ সালে এক বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনি; তার ডান হাত স্থায়ীভাবে অচল হয়ে যায়। একই বছর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলি রাজাই নিহত হলে খামেনি নির্বাচনে অংশ নেন এবং বিপুল ভোটে জয়ী হন।

ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তিনি কার্যত যুদ্ধকালীন নেতা ছিলেন। আট বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতে উভয় পক্ষের লাখো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে।

১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। ধর্মীয় বিদ্যায় তুলনামূলক দুর্বল ভাবমূর্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি ধীরে ধীরে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, সংসদ, নিরাপত্তা বাহিনী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুগতদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

ভিন্নমত দমন ও বিতর্ক

খামেনির শাসনামলে বিরোধিতা কঠোরভাবে দমন করা হয়। ১৯৯৯ সালের ছাত্র আন্দোলন, ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ এবং ২০১৯ সালের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি-ঘিরে প্রতিবাদ কঠোর হাতে দমন করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হন।

২০২২ সালে মাহসা আমিনির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে; শত শত মানুষ নিহত ও হাজার হাজার গ্রেপ্তার হন বলে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দাবি করে।

নারী শিক্ষায় কিছু বাধা অপসারণ করলেও লিঙ্গসমতায় তিনি আস্থাশীল ছিলেন না। হিজাববিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া নারীদের গ্রেপ্তার ও দণ্ডিত করা হয়।

পররাষ্ট্রনীতি ও পারমাণবিক ইস্যু

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে প্রায়শই ‘একঘরে রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা হতো। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’-এর অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

লেবাননে হিজবুল্লাহকে সমর্থন এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বৈরিতার কারণে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়। পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়। খামেনি একসময় পারমাণবিক অস্ত্রকে ইসলামবিরোধী ঘোষণা করলেও পশ্চিমা দেশগুলো সন্দেহ প্রকাশ করে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতে তিনি সরাসরি বাধা দেননি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে গিয়ে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে উত্তেজনা আবার বাড়ে।

২০২৫ সালে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যুক্ত হলে খামেনি আত্মসমর্পণ না করার অঙ্গীকার করেন।

২০২৬ সালের শুরুতে অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দিলে কঠোর দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

দীর্ঘ তিন দশক ধরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা খামেনির মৃত্যু দেশটির রাজনীতিতে এক অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা করল। কে তার উত্তরসূরি হবেন-তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।

বর্তমান ইরান তার নির্ধারিত নীতিমালার ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে তার অবর্তমানে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে বদলাবে এবং দেশ কোন পথে এগোবে-তা এখনো অনিশ্চিত।

সূত্র: বিবিসি