টিসিবির ট্রাকে স্বস্তি, নাকি সংগ্রাম?

এফএনএস | প্রকাশ: ২ মার্চ, ২০২৬, ০৮:০৪ পিএম
টিসিবির ট্রাকে স্বস্তি, নাকি সংগ্রাম?

রমজান সামনে রেখে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন সারা দেশে তেল, ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর বিক্রি হচ্ছে বাজারদরের চেয়ে কম দামে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ৫৯০ টাকায় যে প্যাকেজ পাচ্ছেন, খোলা বাজারে তার জন্য ব্যয় হতো প্রায় ৯০০ টাকার বেশি। অর্থাৎ সাশ্রয় প্রায় ৩০০ টাকারও বেশি। উচ্চমূল্যের চাপে থাকা পরিবারের জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এই স্বস্তির পথ মোটেই মসৃণ নয়। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার বা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টিসিবির ট্রাক ঘিরে প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ সারি। সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন। বয়স্ক বা শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ ঠেলাঠেলিতে টিকতে পারছেন না। লাইনে দাঁড়িয়েও সিরিয়াল ভেঙে সামনে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সুশৃঙ্খল বণ্টনের বদলে অনেক জায়গায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে দ্বিগুণ মানুষ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। এতে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে চাহিদা তুঙ্গে। বাজারে দুই লিটারের তেলের দাম প্রায় ৩৯০ টাকা, আর টিসিবির ট্রাক থেকে তা পাওয়া যাচ্ছে ২৩০ টাকায়। এই বড় ব্যবধানই তেলকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উসকে দিচ্ছে। কোথাও কোথাও বরাদ্দের তুলনায় তেল কম থাকার অভিযোগ উঠেছে। টিসিবির পক্ষ থেকে অভিযোগ যাচাই ও প্রমাণ পেলে ডিলারশিপ বাতিলের আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর নজরদারির প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শুধু ঢাকাতেই নয়, সিরাজগঞ্জ ও চট্টগ্রামেও বণ্টনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়ের বদলে ইফতারের আগে বিক্রি শুরু, তালিকাভুক্ত স্থানের পরিবর্তন কিংবা সরবরাহে বিলম্ব-এসব কারণে লাইনে দাঁড়ানো মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। চট্টগ্রামে একাধিকবার পণ্য নেওয়া ঠেকাতে আঙুলে অমোচনীয় কালি লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক হলেও সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতের জন্য তা যথেষ্ট নয়। মূল সমস্যা দুটি-চাহিদার তুলনায় সীমিত সরবরাহ এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা। বাজারদর যখন নাগালের বাইরে, তখন স্বাভাবিকভাবেই টিসিবির ট্রাক হবে নিম্নআয়ের মানুষের প্রধান ভরসা। সেই ভরসাকে যদি ঠেলাঠেলি, অনিয়ম ও অনিশ্চয়তা গ্রাস করে, তবে সামাজিক অস্বস্তি বাড়বে। অতএব প্রয়োজন আরও ট্রাকসংখ্যা বৃদ্ধি, ডিজিটাল টোকেন বা স্মার্ট কার্ডভিত্তিক বণ্টনব্যবস্থা, বয়স্ক ও নারী-প্রাধান্যপ্রাপ্ত আলাদা লাইন এবং কঠোর তদারকি। টিসিবির উদ্যোগ জনবান্ধব-কিন্তু তার বাস্তবায়ন যদি মানবিক ও সুশৃঙ্খল না হয়, তবে সাশ্রয়ের আনন্দও পরিণত হবে দৈনন্দিন সংগ্রামে।