হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলেই জাহাজে আগুন, হুঁশিয়ারি ইরানের

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ৩ মার্চ, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলেই জাহাজে আগুন, হুঁশিয়ারি ইরানের

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে তা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তেহরানের এই অবস্থানের পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে, তেল ও গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস এই ঘোষণা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যে বাহিনীর প্রধান কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ। কেউ যদি পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিপ্লবী গার্ডস এবং নিয়মিত নৌবাহিনীর সেনারা জাহাজে আগুন দেবে।”

আল জাজিরা বলছে, বিপ্লবী গার্ডের টেলিগ্রাম চ্যানেলেও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তেলের পাইপলাইনেও হামলা চালানো হবে এবং অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। জাবারি দাবি করেন, কয়েক দিনের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশই এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এখানে যেকোনো বিঘ্ন বিশ্ববাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।

এএফপি জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ দিয়ে যাত্রায় আগ্রহী নাবিক এখন খুব কম। বিশ্বের শীর্ষ শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের জাহাজকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। ইতালিয়ান সুইস এমএসসি, ডেনমার্কের মায়েরস্ক, ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম, জার্মানির হাপাক লয়েড এবং চীনের কসকো তাদের রুট সাময়িকভাবে স্থগিত বা পরিবর্তন করেছে।

সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে পড়েছে। ড্রোন হামলার পর বিশ্বের অন্যতম বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদক কাতারএনার্জি উৎপাদন স্থগিত করেছে। এর ফলে ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ এবং এশিয়ায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় প্রণালি বন্ধ থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান নিউবার্জার বারম্যানের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার হাকান কায়া বলেন, “ঝুঁকির মাত্রা কতখানি তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এক বা দুই সপ্তাহের আংশিক স্থবিরতা সামাল দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এক মাস বা তার বেশি সময় বন্ধ থাকলে অপরিশোধিত তেলের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছে যাবে।”

ফরাসি হাই ইনস্টিটিউট ফর মেরিটাইম ইকোনমির পরিচালক পল টুরেট বলেন, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান ইরাক যুদ্ধের সময়ও তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা হয়েছিল, কিন্তু প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফ্রান্সের নৌবাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা পরিচালক সিরিল পোয়ারিয়ে কুতানসাইস বলেন, এই প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার নজির নেই।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব কমাতে ওয়াশিংটন ব্যবস্থা নেবে। তিনি জানান, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল এবং ধাপে ধাপে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই উত্তেজনা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।